ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

চুরি-ছিনতাইয়ে এগিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারীরা

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১৬:৩৫, ২৮ জানুয়ারি ২০২২
চুরি-ছিনতাইয়ে এগিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারীরা
ফাইল ছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রাম এটি। কথিত আছে- অনেক বছর আগে ধর ও মণ্ডল নামে দুই বিশিষ্ট লোক গ্রামটিতে থাকতেন। তাদের নামেই গ্রামের নাম রাখা হয় ‘ধরমণ্ডল’।

চারদিকে সবুজ-শ্যামলিমায় ঘেরা এ গ্রামটি সবার কাছে যেমন নান্দনিক ও আলোকিত, তেমনি আলোচিতও। অনেকের মতে, গ্রামটিতে রয়েছে নারী ছিনতাইকারী তৈরির কারখানা!

দেশের দ্বিতীয় রাজধানী চট্টগ্রাম। এ নগরীর অলিগলিতে নারী ছিনতাইকারীর মাধ্যমে ঘটে যাওয়া অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ধরমণ্ডলের নাম। অনুসন্ধান বলছে, গ্রামটির অন্তত ৩০-এর বেশি পেশাদার নারী ছিনতাইকারীর অবস্থান এখন বন্দর নগরী চট্টগ্রাম।

Advertisement

আবার ধরমণ্ডলের শুধু দুই বাড়িরই ২৮ নারী যেন ছিনতাইয়ের ‘বাহাদুর’। এর মধ্যে একটি বাড়ির ২০ জন ও আরেক বাড়ির আটজন রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক ছিনতাই মামলা।

চার গ্যাংয়ে নগর দাপাচ্ছে নারী ছিনতাইকারী

চট্টগ্রাম নগরীতে দিন দিন বাড়ছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। এসব ছিনতাইয়ে নাম উঠে এসেছে ৭৩ জন পেশাদার নারী ছিনতাইকারীর। চারটি গ্যাংয়ে নগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। পুলিশের নথি বলছে, পাঁচ বছরের অন্তত অর্ধ শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে গ্যাংগুলো। তবে ভুক্তভোগীদের মতে, এ সংখ্যা আরো বেশি।

নিজেরা নারী, টার্গেটও নারী

নিজেরা নারী হওয়ায় নারীরাই থাকে তাদের টার্গেট। টেরীবাজার, নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেট, সিনেমা প্যালেস, আন্দরকিল্লা ও লালদীঘিসহ নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর সুবিধামতো জায়গায় অবস্থান নিয়ে একা চলা নারীদের অনুসরণ করেন তারা। এরপরই সুযোগ বুঝে করেন ছিনতাই। এছাড়া কখনো গাড়িতে যাত্রীবেশে, কখনো কৃত্রিম জটলা পাকিয়ে, আবার কখনো বুয়া কিংবা ভিক্ষুকের বেশে ছিনতাইকর্ম সারেন তারা।

পুলিশের নজর চার গ্যাং

নগরীতে যেখানেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, সেখানেই চার নারী গ্যাংয়ের সদস্যদের খোঁজে থাকে পুলিশ। নারী ছিনতাইকারী মানেই নাসিরনগর, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া কিংবা কক্সবাজার গ্যাং।

পুলিশের ভাষ্য, ছিনতাইকর্মে এগিয়ে নাসিরনগরের ‘ধরমণ্ডল গ্যাং’। এ গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রোজিনা, মর্জিনা, রহিমা, সোমা, মরিয়ম, রোকসানা, কোহিনুরসহ অন্তত ১২ জন নারী। কুমিল্লা গ্যাংয়ে রয়েছেন রাশেদা, আয়েশা, রুমা, রেখা, মেরিসহ ১৩ জন; কুষ্টিয়া গ্যাংয়ে রয়েছেন রহিদা, ববিতা, পাপিয়া, শান্তাসহ নয়জন এবং কক্সবাজার গ্যাংয়ে নুর ফাতেমার নেতৃত্বে রয়েছেন স্বপ্না, শাহনাজ, কুলসুমাসহ ১৩ জন।

টিকটকারের আড়ালে দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী

গত বছরের ৩১ জুলাই রাতে নগরীর ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ এলাকা থেকে ফারজানা বেগম নামে এক নারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সবার কাছে নিজেকে টিকটক ও লাইকি মডেল হিসেবে জাহির করলেও তিনি ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী। সে সময় তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা ছিল বলে জানায় পুলিশ।

কিশোরদের নিয়ে নিজস্ব একটি ছিনতাইকারী দল গড়ে তোলেন ফারজানা। নারী-পুরুষ উভয়ই থাকতো তাদের টার্গেট। তবে দুটি ক্ষেত্রে অবলম্বন করতেন আলাদা আলাদা কৌশল। একা পথ চলা ছেলেদের টার্গেট করে ঠিকানা জিজ্ঞেস করার নামে থামাতেন। এরপর ছোরা দেখিয়ে সঙ্গে থাকা টাকা, মোবাইলসহ দামি জিনিসপত্র হাতিয়ে নিতেন। কেউ দিতে না চাইলে দিতেন ইভটিজিং ও যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনার হুমকি। এ অবস্থায় অনেকে সম্মানহানির ভয়ে সবকিছু দিয়ে চলে যেতেন। একইভাবে ঠিকানা জিজ্ঞেস করার নামে থামাতেন মেয়েদেরও। এরপর ছোরার ভয় দেখিয়ে ছিনিয়ে নিতেন সবকিছু।

ফারজানার স্বামী রুবেলও ছিনতাইকারী দলের একজন সক্রিয় সদস্য। ফারজানাকে গ্রেফতারের কয়েকদিন আগেই অস্ত্র ও ছোরাসহ রুবেলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় ১১টি মামলা রয়েছে বলে সে সময় জানায় পুলিশ। মূলত স্বামী-স্ত্রী মিলেই সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দল গড়ে তোলেন। একই বছরের ১৯ জুলাই নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ে ঘটে যাওয়া একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে তাদের তথ্য।

আসামি একাধিক মামলার, ৯ জনের সাজা

দুর্ধর্ষ নারী ছিনতাইকারী আট মামলার আসামি ফারজানা জেল খেটেছেন সাতবার। এছাড়া পাপিয়া, মরিয়ম, সুহানা, মধুমালা ও হনুফা বেগমের বিরুদ্ধে পাঁচটি করে; রুবিনা, শাহানা, জোহানা, শারমিন, কুশ নাহার ও রিপার বিরুদ্ধে চারটি করে এবং জোসনা ও রুমার বিরুদ্ধে তিনটি করে মামলা রয়েছে। এর বাইরেও অন্যান্য ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা।

সাজা হয়েছে ৯ নারীর। এর মধ্যে ধরমণ্ডলের হোসনে আরা বেগম ও রুবিনা আক্তারের দুই বছর করে এবং চট্টগ্রামের চন্দনাইশের জান্নাতুল মাওয়ার তিন বছর ও ফাতেমা আক্তারের দুই বছর করে কারাদণ্ড হয়। এছাড়াও বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হন জেসমিন, দিলারা, নীল অর্ঘ্য ও রাবেয়া। পুলিশের হিসেব মতে, পাঁচ বছরের ৩৯০ চুরির ঘটনায় ৪০০ নারী গ্রেফতার হয়েছেন চট্টগ্রামে। ৬১ ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন ৭৩ জন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলোজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, অপরাধপ্রবণ পুরুষদের মাধ্যমেই নারীরা ছিনতাই ও চুরিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। একবার যে নারী চুরি-ছিনতাই করে অভ্যস্ত হচ্ছেন, তিনি আর এ কাজ ছাড়তে পারছেন না। এটিকেই উপার্জনের একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তাদের এ অপরাধ থেকে ফেরাতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতাও পালন করা জরুরি।

আলোচিত নাসিরনগরের ধরমণ্ডল ইউনিয়েনের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, মাঝেমধ্যে পত্রিকার পাতায় দেখি ধরমণ্ডল গ্রামের নারীরা চট্টগ্রামে ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়ছেন। তবে কেউ অভিযোগ না করায় কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হয়নি কখনও। বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।

নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, পুরুষের পাশাপাশি নারী ছিনতাইকারীদের ধরতেও আমরা তৎপর রয়েছি। এর মধ্যে অনেককেই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ততম এলাকা, বিভিন্ন মেলা ও মার্কেটগুলোতে তাদের আনাগোনা বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরাই থাকে তাদের টার্গেট। কোনো নারীকে একা পেলে বিভিন্ন কৌশলে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা, মোবাইল ফোনসহ দামি জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয় তারা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!