রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি, যেখান থেকে জীবিত ফেরে না কেউ
রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে টেকনাফের শালবন, টইঙ্গার পাহাড়, মিজ্জির ছড়া পাহাড়, পানের ছড়াসহ বিশাল পাহাড়ি এলাকার ঘটনা। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ এলাকাকে বলা হয় খুনের পাহাড়। সেখানে গেলে কেউ জীবিত ফিরে আসে না।
অনেকে ঐ অঞ্চলকে কুখ্যাত রোহিঙ্গা ডাকাত হাকিমের ঘাঁটি হিসেবেও জানে। বেশ কয়েকটি ডাকাত দলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এ পাহাড়ি বনভূমিতে। এ এলাকায় প্রায়ই অপহরণ-হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ কারণে তারা এ পাহাড়ি এলাকার নাম দিয়েছে ‘খুনের পাহাড়’।
স্থানীয়দের দাবি, এ পাহাড়ি এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ, মুক্তিপণ দাবিসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এ কারণে সৃষ্টি হচ্ছে একের পর এক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠন। এদের তৎপরতা ও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ছড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকাতেও।
.png)
জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল টেকনাফের মিনাবাজার এলাকার স্থানীয় যুবক আকতার উল্লাহকে ধানক্ষেত থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। অপহরণকারীরা তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে ২০ লাখ টাকা দাবি করে। ধার-দেনা করে আকতারের বাবা মৌলভী আবুল কাশেম ১ লাখ টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তবু ছেলের খোঁজ পাননি। তিনদিন পর উনছিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অদূরে আকতারের গুলিবিদ্ধ লাশ পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সেই লাশ উদ্ধারের ঘটনার সূত্র ধরেই উদঘাটন করা হয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য মতে, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার পর ক্যাম্প ছেড়ে মিয়ানমারের গহীন অরণ্যে আশ্রয় নিয়েছে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। তবে তাদের তৎপরতা চলছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) নাম ব্যবহার করে কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় রয়েছে ইসলাম ও মাস্টার গ্রুপের ২০-২৫ জন। তবে এদের কেউই আরসার সদস্য নয় বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের।
টেকনাফের শালবন, টইঙ্গার পাহাড় ও মিজ্জির ছড়া পাহাড়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে অপহরণ ও নিহত হয়েছেন- এমন কয়েকজনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ঝিমনখালী মিনাবাজারের দুই যুবক ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের এক রাতে পাহাড়ের পাদদেশে ফসল পাহারা দিতে গিয়ে অপহৃত হন। পরে তিন দফায় মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা করা হয় তাদের। একই সময় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড দেখে ফেলায় খুন করা হয়েছিল পুটিবনিয়া এলাকার এক চাষিকে।
গত বছরের জুলাইয়ে অপহরণের শিকার হন টেকনাফের শামলাপুর এলাকার সিএনজিচালক মাহমুদুল করিম। ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাইলেও অপহরণকারীদের দেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। অপহরণের এক মাস পর বনবিভাগের লোকজন জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে মাহমুদুল করিমের কঙ্কাল খুঁজে পান। ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দিয়ে তাকে হত্যা করানো হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বাসিন্দা আরিফুর জানান, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়া কেটে কয়েকটি পথ তৈরি করেছে। সেসব পথ দিয়েই ক্যাম্প ও পাহাড়ে যাতায়াত করে তারা। এ কারণে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আতঙ্ক।
স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ মানুষকে অপহরণ করে মিজ্জির ছড়া পাহাড়ে আটকে রাখে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। কারণ, এ পাহাড়ের সঙ্গে টেকনাফের সব পাহাড়ের সংযোগ রয়েছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার শাহ আলম জানান, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তৎপরতা দিনদিন বাড়ছে। তাদের তাণ্ডবে নিরীহ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণ অসহায় হয়ে পড়েছে। উনছিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পেছনে গত বছর দুইজনকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া অনেকেই নিখোঁজ রয়েছে।
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্মূল করতে আমরা কাজ করছি। ক্যাম্পে এপিবিএনের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্থানীয় রোহিঙ্গা ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে পাহারা জোরদার করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে।