সবশেষ গত শনিবার (৪ জানুয়ারি) দুপুরে সদরঘাট থানার পোড়া মসজিদ এলাকায় দোকানের সামনে থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে শুভাশিষ বসু নামে এক মোবিল ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মাইক্রোবাসে তুলে শুভাশিষের হাতে হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে দেন অপহরণকারীরা। হাটহাজারী এলাকার একটি ঘরে নিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়। স্বজনরা বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করলে ব্যবসায়ী শুভাশিষ বসুকে উদ্ধারে মাঠে নামে সদরঘাট থানা পুলিশ। পুলিশের তৎপরতার খবরে ঐদিন রাত ১০টার দিকে শুভাশিষ বসুকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় মোহাম্মদ রায়হান নামে এক মাইক্রোবাস চালককে গ্রেফতার করেছে সদরঘাট থানা পুলিশ। জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন থানার সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিম।
.png)
অপহরণের শিকার ব্যবসায়ী শুভাশিষ বসু বলেন, কদমতলী পোড়া মসজিদ এলাকায় বর্ণালী লুব্রিক্যান্ট নামে একটি মোবিলের দোকান রয়েছে আমার। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারে দোকানে যাই। দোকানের সামনে গাড়ি থেকে নামতেই পেছন থেকে দুই যুবক আমাকে ধরে ধাক্কা দিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলেন। এ সময় দোকানের কর্মচারী লিটন বাধা দিলে তাদের একজন বলেন- আমরা ডিবির লোক। শুভাশিষের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে। তাকে খুলশী থানায় নিয়ে যাচ্ছি।
শুভাশীষ বলেন, মাইক্রোবাসে তোলার পর আমার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেওয়া হয়। একটি গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। গাড়িতে চালকসহ তারা চারজন ছিলেন। সবার মুখে দাড়ি ছিল। বয়স আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০ বছর। গাড়ি চলতে চলতে তারা আমাকে বলেন- তোর বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর মামলা হয়েছে। ওয়ারেন্ট আছে। তোকে খুলশী থানায় নিয়ে যাবো। যা বলার ওসি সাহেবের কাছে বলবি। কিন্তু তারা আমাকে খুলশী থানায় নেননি। প্রায় দুইঘণ্টা গাড়ি চলার পর আমাকে সিঁড়ি বেয়ে একটি রুমে ঢুকিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেয়। ঐ রুমে দশটি প্লাস্টিকের চেয়ার থাকলেও তারা আমাকে মেঝেতে বসিয়ে রাখেন। বিকেল ৩টার দিকে বাথরুমে যেতে চাইলে একটি হাতকড়া খুলে দেন।
ভুক্তভোগী শুভাশীষ বলেন, আমাকে কেন তুলে নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তারা বলেন- তোমাকে আমাদের চাহিদামতো মুক্তিপণ দিতে হবে। সন্ধ্যায় আমাদের একজন আসবেন। তিনি কথা বলবেন। এরমধ্যে বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে একজন এসে বলেন- তোমার লোকজন সদরঘাট থানায় গেছে কেন? সদরঘাট থানা পুলিশ আমাদের গাড়ি চিনে গেছে। তোমার লোকজনকে থামাও।
সদরঘাট থানায় আমার স্বজনদের যাবার বিষয়টি তারা কীভাবে জেনে যান তা আমি বুঝতে পারিনি- যোগ করেন শুভাশীষ।
তিনি বলেন, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঐ ঘরের সামনে আরেকটি প্রাইভেটকার এসে থামে। তারা ঘরের সব লাইট বন্ধ করে দেন। আমাকে আবার হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে ঐ প্রাইভেটকারে উঠানো হয়। গাড়িটি প্রায় ৫০ মিনিট চালানোর পর আমাকে আরেকটি ঘরে নেয়া হয়। এ সময় অপহরণকারীরা বলেন- তোমাকে ছেড়ে দেবো। তবে সদরঘাট থানা পুলিশকে থামাও। ছেড়ে দেওয়ার পর মামলাও করতে পারবে না। মামলা করলে জানে মেরে ফেলবো।
শুভাশীষ বলেন, প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা পর তারা আমাকে ঐ প্রাইভেটকারে তুলে আমার মোবাইল ও চশমা ফেরত দেন। রাত আনুমানিক ১০টার দিকে হাটহাজারীর চৌধুরীহাট পার হয়ে সড়কের পাশে আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেন। গাড়ি থেকে নামার পর আমার স্বজনদের ফোন দেই। তারা পুলিশ নিয়ে শহরের অক্সিজেন এলাকা পর্যন্ত এসেছেন বলে জানান। পরে চৌধুরীহাট এলাকা থেকে তারা আমাকে উদ্ধার করেন।
সদরঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণের ঘটনায় সোমবার রাতে কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকা থেকে মোহাম্মদ রায়হান নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্যবসায়ীকে যে মাইক্রোবাসে অপহরণ করা হয়েছিল, সেটির চালক রায়হান। ঐ মাইক্রোবাসটি উদ্ধার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ওসি আরো বলেন, আমি এ থানায় মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। থানা এলাকার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকবো।
এর আগে, গত ৯ ডিসেম্বর একই থানার পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকার যুগীচাঁদ লেনের রামকৃষ্ণ ফার্মেসির মালিক রাজু মজকুরিকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে দোকান থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশের এক কনস্টেবলসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন ঐ পুলিশ কনস্টেবল। তিনি নগর পুলিশের পশ্চিম জোনের ডিসির অর্ডারলি ছিলেন।
তবে শুধু সদরঘাট নয়, সম্প্রতি ব্যবসায়ী অপহরণের ঘটনা ঘটেছে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ ও জেলার সাতকানিয়া থানা এলাকায়ও।
গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সাতকানিয়া উপজেলার জোটপুকুরিয়া বাজার থেকে অপহরণের শিকার হন দক্ষিণ কাঞ্চনার পল্লী চিকিৎসক রতন দাশ। চাঁদার দাবিতে তাকে কুপিয়ে আহত করেন অপহরণকারীরা। পরে চাঁদা দিতে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়ে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যান। স্থানীয়রা আহত রতন দাশকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
গত ২৬ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার মাইজপাড়ার আনোয়ারুল আজিম পেট্রোল পাম্প এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ। একটি প্রাইভেটকারে তাকে তুলে নিয়ে যান অপহরণকারীরা। পরে তার স্ত্রীর কাছে মুক্তিপণ হিসেবে চার লাখ টাকা দাবি করা হয়। ঐদিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে হাটহাজারী উপজেলার বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মুক্তিপণের টাকা নিতে আসা ছয়জনকে আটক করে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ।
এর একমাস আগে ২৬ অক্টোবর পাঁচলাইশ থানা এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন ব্যবসায়ী ছৈয়দুল আলম তালুকদার। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বাসিন্দা। থাকেন নগরের বহদ্দারহাট এলাকায়। ২৬ অক্টোবর দুপুরে মোটরসাইকেলে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৭ অক্টোবর স্বজনদের কাছে দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। পরে ৩১ অক্টোবর ভোরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কাকারা পাইথন পাহাড় থেকে ছৈয়দুল আলম তালুকদারকে উদ্ধার করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ।