ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

দিনাজপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অপমৃত্যুর সংখ্যা

১৪ মাসে এক হাজার ১১৬ জনের আত্মহত্যা
দিনাজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:০৪, ৪ মার্চ ২০২৬
দিনাজপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অপমৃত্যুর সংখ্যা
ফাইল ফটো

দিনাজপুর জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অপমৃত্যুর সংখ্যা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ মাসে জেলার ১৩টি উপজেলায় অন্তত এক হাজার ১১৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর সিভিল সার্জন অফিস ও দিনাজপুর পুলিম সুপার কার্যালয় সূত্রে এসব জানা গেছে।

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক হাজার ১১৬ জন মানুষের অপমৃত্যু বা আত্মহত্যা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে ৯৩৭ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৫১৬ জন ও মহিলা ৪২১ জন। নেশাজাতীয় ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেছে ৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪১ জন ও মহিলা ৪৪ জন। আর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৯৪ জন, এর মধ্যে পুরুষ ৪১ জন ও মহিলা ৫৩ জন। এদের মধ্যে ২৮ জনের তথ্য রয়েছে বোচাগঞ্জ থানার নথিতে, আর বাকি ঘটনাগুলো জানা গেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। সব মিলিয়ে গত আট মাসে উপজেলায় শতাধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৭-১৮ বছর থেকে শুরু করে আত্মহত্যা করা অধিকাংশ মানুষের বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে। দীর্ঘদিনের রোগভোগ, মানসিক অবসাদ, প্রেমে ব্যর্থতা, অনলাইন জুয়া, অনলাইন গেমে আসক্তি পরকীয়া ও অর্থনৈতিক কষ্টের কারণে তারা গলায় ফাঁস দিয়ে অথবা বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন। তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে অবৈধ মাদকের নেশায় আসক্তি, ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব, পারিবারিক অশান্তি, জীবন নিয়ে হতাশাজনিত কারণে।

Advertisement

পারিবারিক ও বোচাগঞ্জ থানার নথিভুক্ত থেকে জানা যায়, উপজেলার লোহাগাঁও গ্রামের  নবম শ্রেণীর ছাত্র মোজাহারুল ইসলাম (১৫) ফ্রি ফায়ার গেমে আসক্ত ছিল। পরিবার থেকে  নিষেধ করায় গত ১২ জুলাই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। ৩০ মে মতিজাপুরের পইসান্জু রায় (৫০) কিডনি ও পেটের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। ৬ সেপ্টেম্বর মরিয়ম বেগম (৭২) শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার যন্ত্রণায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

দিনাজপুর কোতয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ নূরনবী বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধুমাত্র আইনি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। পরিবার ও সমাজকে সচেতন হতে হবে। আমরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি।

বোচাগঞ্জ ইউএনও মারুফ হাসান বলেন, অপমৃত্যু রোধে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আমরা সেমিনার করছি এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন স্বাস্থ্য বিভাগ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে কাজ করছে।

বোচাগঞ্জ থানার এসআই শামীম আকতার অপমৃত্যু প্রতিরোধে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, অপমৃত্যু বন্ধে সমাজের সর্বস্তরের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের কার্যকরী সমন্বিত উদ্যোগের বিশেষ প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে পারিবারিক সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে যেসব কারণে মানুষ আত্মহত্যার মতো জঘন্য কাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে যেমন: ডিপ্রেশন, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক চাপ ও বোলিং, নেশায় আসক্তি, প্রেমে ব্যর্থতা, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অনলাইন আসক্তি প্রভৃতি প্রতিরোধে সমাজের সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

দিনাজপুরের একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, মানসিক চাপ, অবসাদ ও একাকিত্ব মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তাই শুধু আইন দিয়ে নয়, পারিবারিক ভালোবাসা, সামাজিক সহমর্মিতা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে এগিয়ে এলে এই মৃত্যু মিছিল থামানো সম্ভব।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!