স্থানীয়রা জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন, খাল-বিল ভরাট, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, মাছের আবাসস্থল ধ্বংসসহ নানা কারণে এমনিতেই দেশীয় প্রজাতির মাছ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে চলছে। এরমধ্যে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে মাছ ধরার যেন মহোৎসব চলছে। এতে করে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব যেন হুমকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ওইসব জালের ব্যবহার দ্রুত বন্ধ না করলে দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
সরেজমিনে উপজেলার ধরখার এলাকায় দেখা যায়, একশ্রেণির অসাধু মৎস্য শিকারি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জাল দিয়ে নদী থেকে মাছ নিধন করছেন। এরমধ্যে বেশীভাগ শিকারি দুয়ারী জাল দিয়ে মাছ শিকার করছেন।
.png)
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চায়না দুয়ারী জালটি অন্যান্য জালের চাইতে রয়েছে অনেকটাই আলাদা। এই জালটি সাধারণ জাল থেকে এক ফুটের উপর উচ্চতা ও ৬০ থেকে ৯০ ফুট দৈর্ঘ্য হয়ে থাকে। যা ক্ষুদ্র ফাঁসবিশিষ্ট ধনুক আকৃতির হয়। লোহার রড় ও রডের রিং দিয়ে খোপ আকারের বাক্স তৈরি করে চারপাশ সূক্ষ্ম জাল দিয়ে ঘেরাও করে জালটি তৈরি করা হয়। দেখতে ছোট ছোট খোপের মতো। এরপর বাঁশের খুঁটির সঙ্গে জালের দুই মাথা বেধে পেতে রাখা হয়। মূলত এই জাল পানির নিচে পাতা থাকায় তা সহজে চোখে পড়ে না। তবে অগভীর পানিতে অন্যান্য বসানো জাল ও পুঁতে রাখা খুঁটির মাধ্যমে তার উপস্থিতি বোঝা যায়।
এই জালে আটকা পড়ছে ছোট বড় সব ধরনের মাছ। পাশাপাশি শামুক-ঝিনুক, ব্যাঙ, কাঁকড়া, সাপ, কুচিয়াসহ বহু জলজ প্রাণি প্রাণীও রক্ষা পায় না।
মাছ শিকারিরা জানায়, এই জাল অতি সহজে বাজারে পাওয়া যায়। প্রতিটি জালের দাম তিন থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই জালে ছোট বড় সব মাছ ধরা পড়ে। ফলে মাছ শিকারিরা এই জালে মাছ ধরতে ঝুঁকছেন বেশি।
উপজেলার ধরখার এলাকার রতন মিয়া জানান, এবার অন্যান্য বছরের চাইতে পানি কিছুটা কম হয়েছে। কিন্তু এক শ্রেণির লোকজন নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে প্রতিদিন সকাল ও বিকেল নানা জাতের দেশীয় মাছ ধরে বিক্রি করছেন। এভাবে চলতে থাকলে এলাকার দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
বনগজ গ্রামের হেলাল মিয়া বলেন, একসময় কারেন্ট জালের কারণে দেশীয় মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন সেই ধ্বংসযজ্ঞ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে চায়না দুয়ারী জাল। এই জালে বড় মাছের পাশাপাশি রেণু, ডিম ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকা পড়ছে।
এতে করে অনেকটাই যেন মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। দেশীয় মাছ কমে যাওয়ায় বাজারে হাইব্রিড মাছের আধিপত্য বেড়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
গোলাম মুুর্শেদ রিপন বলেন, প্রতিদিন সকালে হাটতে বের হলে দেখা যায় লোকজন নানা প্রকারের জাল দিয়ে মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। যারা চিরাচরিত বড় জাল দিয়ে মাছ ধরতো এখন তাদের তেমন দেখা যায় না। বেশীভাগ লোকজন চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরছেন।
আলমগীর হোসেন বলেন, আগে খাল বিল জলাশয় ও নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না জালের কারণে মাছ পাওয়া যায় না। চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে যেভাবে বিভিন্ন প্রজাতির দেশিয় মাছের পোনা ধরা হচ্ছে, দ্রুত তা বন্ধ করা না হলে এসব মাছ অচিরেই হারিয়ে যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাছ শিকারি জানান, এক সময় বড় বেড় জাল দিয়ে মাছ ধরা হতো। বন্যা না হওয়ায় পানিও তেমন হয়নি। তাছাড়া এখন ওই জালে তেমন মাছ উঠে না। তাই চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে মাছ ধরছি। তিনি আরও বলেন চায়না দুয়ারী জাল সহজে নষ্ট হয় না এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া দামও তুলনামূলক কম রয়েছে। দেশীয় জাল দ্রুত পচে যাওয়ায় তা বারবার তুলে শুকাতে হয়। কিন্তু চায়না দুয়ারী জাল পানিতে রেখেই মাছ ধরা সম্ভব।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলার ৯৮.০৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে মোট গ্রাম রয়েছে ১৩০টি। এরমধ্যে ছোট বড় পুকুরসহ প্রজেক্ট রয়েছে ২৩৪৮ টি,বিল রয়েছে ১৩টি ,নদী ৩টি, খাল ৩টি, ও প্লাবণ ভূমি রয়েছে ৮টি।
আখাউড়া উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, নিষিদ্ধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে মাছ শিকার করার কোন সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে তিতাস নদীতে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে জাল আটক ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হয়েছে। কোনোভাবেই নিষিদ্ধ ওইসব জাল দিয়ে মাছ ধরতে দেওয়া যাবে না। ওইসব নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।