ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

টাঙ্গাইলের শতবর্ষী মিষ্টি শিল্প ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে তিন দিনের উৎসব

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২১:৩৫, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
টাঙ্গাইলের শতবর্ষী মিষ্টি শিল্প ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে তিন দিনের উৎসব
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

টাঙ্গাইলের শতবর্ষী মিষ্টি শিল্প, লোকজ ঐতিহ্য ও স্থানীয় পণ্যকে দেশ-বিদেশে তুলে ধরতে প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল ২০২৬’। জেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, বিশেষ করে পোড়াবাড়ীর চমচমের পাশাপাশি টাঙ্গাইলের বিখ্যাত তাঁতের শাড়িও এ উৎসবে প্রদর্শন করা হচ্ছে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে টাঙ্গাইল শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

আয়োজকেরা জানান, ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এ উৎসবে জেলার ১২ উপজেলা থেকে ২৩টি স্টল অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি স্টলে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি এবং তিনটি স্টলে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে।

Advertisement

উৎসব ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি নিয়ে সাজানো হয়েছে স্টলগুলো। স্থানীয় মিষ্টি কারিগর ও উদ্যোক্তারা নিজেদের তৈরি নানা ধরনের মিষ্টি প্রদর্শন করছেন। পাশাপাশি টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়ির স্টলেও দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।

ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা বলেন, টাঙ্গাইলে প্রথমবারের মতো এমন আয়োজন প্রশংসনীয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে এসে মিষ্টির পাশাপাশি টাঙ্গাইলের শাড়ি দেখার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে আয়োজনটি তাদের ভালো লেগেছে।

বিক্রেতারা জানান, তাঁরা বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি নিয়ে উৎসবে অংশ নিয়েছেন। টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। প্রথম দিন থেকেই দর্শনার্থীদের ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের আয়োজন প্রতিবছর করার দাবি জানান তাঁরা।

জেলা মিষ্টি মালিক সমিতির সভাপতি বলেন, ‘এ আয়োজনের মাধ্যমে টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচমের ঐতিহ্য আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে পেরেছি। এতে আমরা আনন্দিত। প্রতিবছর এমন আয়োজন করা হলে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির কদর আরও ছড়িয়ে পড়বে।’

আয়োজকেরা বলেন, টাঙ্গাইলের শতবর্ষের মিষ্টি শিল্পকে সবার সামনে তুলে ধরা এবং জেলার জিআই পণ্যগুলোর ব্র্যান্ডিং করাই এ উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য। মিষ্টি শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ রয়েছে। তাই তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’কে গড়ে তুলতে চান তাঁরা। একই সঙ্গে স্থানীয় পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রতিবছর এ ধরনের উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানান তাঁরা।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘টাঙ্গাইলের চমচম সারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক মানুষই চেনেন। টাঙ্গাইলের শাড়ি যেমন বাংলাদেশের গর্ব ও ঐতিহ্য, তেমনি চমচমও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এই পণ্যকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেটিকে মানুষের মাঝে তুলে ধরার জন্যই এ আয়োজন। টাঙ্গাইলে যে ঐতিহ্য ও অর্জন রয়েছে, তা বাংলাদেশের মানুষের জন্যও গর্বের বিষয়। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে আগামী দিনে ঐতিহাসিক ও নিরাপদ টাঙ্গাইল গড়ে তুলতে চাই। এ ব্যাপারে সবার সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’

মিষ্টি উৎসবের উদ্দেশ্য তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এই ফেস্টিভ্যালের কয়েকটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, টাঙ্গাইলের পণ্য মানুষের মাঝে তুলে ধরা এবং এগুলো নিয়ে মানুষকে অবহিত করা। একই সঙ্গে সারা দেশের মানুষের কাছে আমাদের ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠিত করা।’

চমচম বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে গোপালপুরের একটি অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি ও চমচম নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি আনারসের কথাও বলেছিলেন। টাঙ্গাইলের এই চমচমকে কীভাবে বিদেশে রপ্তানি করা যায়, সে ব্যাপারে আমরা পদক্ষেপ নেব।’

চমচম শিল্পের প্রসার ঘটাতে পারলে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি এ শিল্পে মানুষের আগ্রহ ও কর্মসংস্থান বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এতে প্রান্তিক অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘টাঙ্গাইলের শাড়ির বিদেশে প্রচুর কদর রয়েছে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলে তাঁতিদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে যারা শাড়ি তৈরি করেন, তাঁদের স্বল্প সুদে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। যে তাঁতিরা এই কাজ করেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে একটি তাঁতি সমাবেশ করব। এর মাধ্যমে তাঁতশিল্পকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, ‘টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য শুধু টাঙ্গাইলের নয়, এগুলো বাংলাদেশের গর্ব—এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি টাঙ্গাইলের পর্যটন সম্ভাবনাকেও এগিয়ে নেওয়া হবে।’

আয়োজকেরা আশা করছেন, রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র দুই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত টাঙ্গাইলের শতবর্ষী মিষ্টি শিল্প ও লোকজ ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে এ উৎসব জেলার পর্যটন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মিষ্টি কারিগর, তাঁতশিল্পী ও ব্যবসায়ীদের নতুন বাজার ও ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তাঁদের মতে, ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ গড়ে তোলার মাধ্যমে শতবর্ষী মিষ্টি শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করা, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং স্থানীয় পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই এ উৎসবের মূল লক্ষ্য।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: টাঙ্গাইল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!