ভৈরবে আসামি ছাড়ার ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ
কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানায় ইমিগ্রেশন পুলিশের মাধ্যমে হস্তান্তর করা এক আসামিকে গভীর রাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। আসামিকে ছাড়ার সময় আদালতের একটি ‘রিকল’ ব্যবহার করা হলেও সাংবাদিক ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের হাতে আসা ওই নথির কপিতে বিচারকের স্বাক্ষর না থাকায় এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে পুলিশের দাবি, আদালত থেকে ওই আসামির জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রিকল যাচাই-বাছাই করেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় টাকা লেনদেনের অভিযোগও অস্বীকার করেছে পুলিশ।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আরিয়ান খুলুদ নামে ওই আসামিকে ভৈরব থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আরিয়ান খুলুদের বিরুদ্ধে ভৈরব থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও ছিল। সোমবার পর্তুগালের উদ্দেশে বিদেশ যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে ভৈরব থানায় বিষয়টি জানায়।
পরে ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শক্তি পদ মৃধা ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দুপুরের দিকে আরিয়ান খুলুদকে ভৈরব থানায় নিয়ে আসা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তাকে ছাড়িয়ে নিতে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত একটি প্রভাবশালী মহল ওসি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে গভীর রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ মে একটি মামলায় আরিয়ান খুলুদ আদালতে হাজির হয়ে জামিন পান। ওই জামিনের রিকল প্রায় পাঁচ মাসেও ভৈরব থানায় জমা দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে থানায় হস্তান্তরের পর সোমবার রাতে ওই রিকল থানায় জমা দেওয়া হয়।
এরপর পুলিশ রিকলটি যাচাই-বাছাই করে তাকে ছেড়ে দেয়। তবে সাংবাদিক ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সংগ্রহ করা রিকলের কপিতে কিশোরগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর নাম থাকলেও বিচারকের স্বাক্ষর দেখা যায়নি। ফলে স্বাক্ষরবিহীন ওই নথির ভিত্তিতে কীভাবে আসামিকে মুক্তি দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভৈরব থানার এসআই শক্তি পদ মৃধা বলেন, ইমিগ্রেশন পুলিশ আরিয়ান খুলুদকে আটক করে থানায় খবর দেয়। পরে তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। ওই মামলার রিকল আগে থানায় জমা ছিল না। সোমবার রাতে রিকল জমা পড়ার পর ওসি তা যাচাই-বাছাই করেন। যাচাইয়ে রিকল সঠিক পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, আরিয়ানের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন এবং অন্য মামলাগুলোতেও জামিনে আছেন বলে জানান তিনি। আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের টাকা লেনদেন হয়নি বলেও দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ভৈরব থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, পাসপোর্টে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশ আরিয়ান খুলুদকে আটক করে। পরে তাকে থানায় আনা হয়। যাচাই-বাছাই করে তার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই এবং তিনি জামিনে আছেন বলে নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
রিকলে বিচারকের স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘রিকলটি আমার কাছে আগে থেকেই আছে। আমি আদালত থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি যে তিনি জামিনে আছেন।’
কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান শৈলী বলেন, আদালত থেকে মূল রিকল সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফোনে আদালত থেকে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আরিয়ান খুলুদ চারটি মামলাতেই জামিনে আছেন।
স্বাক্ষরবিহীন রিকলের বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, সাংবাদিকদের হাতে থাকা কাগজটি কোথা থেকে এসেছে, তা তিনি জানেন না। সাধারণত স্বাক্ষর ছাড়া রিকল হওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে ওসিকে স্বাক্ষরযুক্ত কপি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক করার পর আসামিকে থানায় আনার প্রক্রিয়া, থানায় জমা দেওয়া রিকলের উৎস, স্বাক্ষরবিহীন কপির ব্যবহার এবং গভীর রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যথাযথ নিয়ম মেনে হয়েছে কি না। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হলে এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হতে পারে।