স্বপ্নপূরণে ১ মাসের চাকরি, মুক্তি মেলে চাঁদরাতে
মেজবাহুর রহমান আরিফ। পড়ছেন রাজধানীর সরকারি বাঙলা কলেজের ইংরেজি বিভাগে তৃতীয় বর্ষে। পড়ালেখার পাশাপাশি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে প্রায়ই খণ্ডকালীন কাজ করতে হয় তাকে। কখনো জরিপকর্মী, কখনো ফুড ডেলিভারি বয়ের কাজ করেন তিনি। তবে রমজানের শুরু থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন পুরদস্তর একজন বিক্রয়কর্মী। রাজধানীর মিরপুরের একটি সুপারশপে এক মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক চাকরি হয় তার। এই চাকরিটা নিজের প্রয়োজন যতটা মিটিয়েছে, তার থেকে বেশি উপকার করেছে তার পরিবারের।
আরিফ বলেন, রমজানে পুরো মাস শিক্ষাঙ্গন বন্ধ। বন্ধুরা অনেকেই বাড়িতে চলে গেছেন। আমারও বাড়িতে চলে যাওয়ার কথা ছিল। তবে কাজ মিলে যাওয়ায় বাড়িতে যাইনি। এক মাস চাকরির এই টাকায় আমার পরিবার কিছু নতুন জামা-কাপড় পাবে। আমার কয়েক মাসের হাত খরচের টাকা হয়ে যাবে। তাই রমজানে একটু কষ্ট হলেও চাকরিটা করেছি।
শুধু আরিফ নন, রাজধানীতে অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যারা রমজান মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক কাজে শ্রম দেন। এদের বেশিরভাগই শ্রম দেন দোকানগুলোতে। পোশাকের দোকান, সুপারশপ, মুদি দোকান, শপিংমল, রেস্তোরাঁসহ নানা ব্যবসাকেন্দ্রে তারা শ্রম বিক্রি করেন। এক মাসের জন্য এই শ্রম বিক্রির পেছনেও থাকে কিছু স্বপ্ন, কিছু তৃপ্তি, কিছু সুখ, কিছু স্বাচ্ছন্দ।
রাজধানীর মিরপুর-১০ এর শাহ-আলি প্লাজার একটি জুতা বিক্রির দোকানে এক মাসের চুক্তিতে কাজ করছেন শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, রমজান মাসে ক্রেতার চাপ বেশি থাকে বলে দোকানগুলো আমাদের (শিক্ষার্থীদের) নিয়োগ দেয়। স্বাভাবিকভাবে সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আমাকে কাজ করতে হয়।
.png)
তিনি জানান, এমন শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্ত মজুরিতে তাদের পরিবার ঈদ করে। তাদের স্নেহের ভাই-বোন নতুন জামা পরে। তাদের মনের মানুষেরাও ছোট্ট কোনো উপহার পায়। নিজের পছন্দের টুকটাক কেনাকাটা হয়। প্রয়োজনের চাহিদা মেটে। কেউবা প্রদেয় ঋণ পরিশোধ করে চিন্তামুক্ত হয়।

ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও অনেকেই করেন এক মাসের এমন খণ্ডকালীন চাকরি। রাজধানীর কচুক্ষেত পুলপাড় এলাকার একটি দোকানে কথা হয় এমন কিছু নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে। রুপা, সারা, রুমা জানান তাদের অভিজ্ঞতা।
তারা জানান, এ মাসে সহজেই কাজ মেলে। মেয়েদের ড্রেস, জুয়েলারি দোকান, প্রসাধনী, শাড়ি, থ্রি-পিসের দোকানগুলোতে নারী কর্মীদের চাহিদা থাকে। সেই সুবাদে অনেক মেয়ের কাজের সুযোগ হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কাজও চিন্তাহীনভাবে করা যায়।
জানা যায়, সাধারণত এক মাসের চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে শিক্ষার্থীরা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আয়ের সুযোগ পান। একটু অভিজ্ঞ থাকলে ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকাও বেতন মেলে। আবার কম্পিউটারে দক্ষ শিক্ষার্থীরা সুপারশপের ক্যাশ কাউন্টারে চাকরির সুযোগ পান। এতে কমপক্ষে ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার পর্যন্ত বেতনের সুযোগ থাকে।
শিক্ষার্থীদের এমন চাকরির চুক্তি শেষ হয় ঈদের চাঁদ উঠলে। চাঁদরাত ১২টা পর্যন্ত দোকানে সময় দেওয়ার চুক্তি হয়। ছুটি মেলার পরই সে রাতেই অনেক শিক্ষার্থী নিজ গ্রামের পথে রওনা হন। এ সময় বাস-ট্রেন-লঞ্চ না মিললেও ট্রাক-পিকআপসহ নানা মাধ্যমে বাড়ি পৌঁছতে হয় তাদের। অনেকেরই আবার ঈদের দিন সকালেও ছুটতে হয় বাড়ির পথে।
রোজা রেখে এক মাস কাজ, চাঁদ রাতের এমন ছোটাছুটি- সবই টাকার প্রয়োজনে। এ প্রয়োজন প্রিয়জনের ভালোবাসা হয়ে ওঠে। এমন কষ্টের টাকায় শরীরে নতুন কাপড় জড়ান অনেক মা-বোনই। তাদের পরনে সেসব কাপড় আর মুখের হাসি পুরো রমজানের কষ্টকে ভুলিয়ে দেবে।