ইন্টারনেট ব্যবহার করেন অথচ ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট নেই এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সবাই একে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে জানে। কিন্তু এ ফেসবুকই এখন সম্পর্ক ভাঙার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এছাড়া একে অন্যের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ ফেসবুক।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেউ যদি বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সম্পর্ক অথবা প্রতারণা করতে চায় তাহলে ফেসবুকই হলো সবচেয়ে সহজ পন্থা। এর মাধ্যমেই কাউকে কাছে টানা যায় আবার দূরেও ঠেলা যায়। ফেসবুকের মাধ্যমে খুব সহজেই যে কেউ প্রেম-নিবেদন কিংবা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে পারেন।
.png)
পাঁচ হাজার বিয়ে-বিচ্ছেদের আবেদন পর্যালোচনা করে ব্রিটিশ আইনি সংস্থা ‘ডিভোর্স অনলাইন’ জানিয়েছে- বিশ্বে এক-তৃতীয়াংশ বিয়ে-বিচ্ছেদের কারণ ফেসবুক ! ‘ডিভোর্স অনলাইন বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দম্পতিদের পরস্পরবিদ্বেষী বিবৃতি, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে সন্দেহজনক ফেসবুক ব্যবহার ও ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি প্রকাশ বিয়ে- বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ হালের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুক।
এক সময় শুধু তরুণ-তরুণীদের কাছে এ সাইটটির খোঁজ-খবর ছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছোট-বড়, তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এ সাইটটির সঙ্গে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে ‘ফেসবুক অ্যান্ড ইউর ম্যারেজ’ গ্রন্থের লেখক কে জেসন ক্রাফস্কি বলেন, ‘কর্মস্থল কিংবা বাড়ির বাইরের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলো মাস কিংবা বছরের ব্যবধানে বাস্তব রূপ নেয়।
ফেসবুকের ক্ষেত্রে মাউসের একটি ক্লিকেই এ ঘটনা বাস্তব হয়।’ তার মতে, ‘সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো প্রচলিত প্রেম-নিবেদনের সাইটগুলোর চেয়ে ভিন্ন। কারণ এর মাধ্যমে পুরানো অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধবের পাশাপাশি মাত্র এক বা দুদিনের পরিচয় হয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গেও বন্ধুত্ব করা যায়। এগিয়ে নেয়া যায় সম্পর্কে। তাছাড়া এর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে পরকীয়া বা গোপনে প্রেম করেও ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে না।’
আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সদস্য জেমস ই. কাটজ আমেরিকার ৪৩টি রাজ্যের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে ফেসবুকের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা তুলে এনেছেন। তাদের হিসাব মতে, বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর মধ্যে ৩২% মানুষ বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী দের অভিমত ফেসবুকের ফলে নতুন রিলেশন তৈরি হয় ফলে পূর্বের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিচ্ছে।
এক সময় বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটছে। দেখা যাচ্ছে, তরুণ সমাজের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারের চহিদা বৃদ্ধির কারণে তারা খেলাধুলা থেকে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছে। তারা বলছেন- অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের ফলে বিষণœতা তৈরি হচ্ছে, মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে এবং ক্ষুধা কমে যাচ্ছে। তবে তারা বলেছেন- ইন্টারনেট মানুষের উপকার করে থাকলেও অপকারের দিকগুলো নেহায়েত কম নয়। যদি ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার করা যায় তাহলে মানুষের মেধার আরও বিকাশ ঘটবে।
কম্পিউটার্স ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার সাময়িকীর একসংখ্যায় প্রকাশিত গবেষণায় এমনটিই দাবি করা - ' ফেসবুক, টুইটার কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ সাইটে বেশি সময় দেওয়া ব্যক্তিরা দাম্পত্য জীবনে অসুখী হতে পারেন, এমনকি বিয়েবিচ্ছেদের কথাও ভেবে থাকতে পারেন।' গবেষকরা বলছেন- দাম্পত্য জীবনে সঙ্গীকে একান্তে ফেসবুক ব্যবহার করতে দেখলে অনেকেই সন্দেহ করেন। বিষয়টিকে কেউ কেউ বিয়ে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু একথা মানতে নারাজ যারা তারা বলছেন- কেন বিয়ে বিয়ে বিচ্ছেদের কারণ হবে ফেসবুক?
আরেক গবেষণা বলছে, দীর্ঘ সময় ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা মানুষকে স্বার্থপর ও সহানুভূতিশূন্য করে তোলে। ৪০০ জনের বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় এ প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরার্ষ্টের গবেষকরা।
গবেষণার ফল সম্প্রতি 'সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে' প্রকাশিত হয়। গবেষকরা জানান, ফেসবুক ব্যবহারকারীরা সব সময় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চান। এতে তাদের আত্মকেন্দ্রিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে চ্যাটের মতো কয়েকটি ফেসবুক ফিচার ব্যবহারকারীদের মধ্যে কিছুটা সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে বলে মনে করেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. ট্র্যাসি অ্যালওয়ের নেতৃত্বে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। ১৮-৫০ বছর বয়সী ফেসবুক ব্যবহারকারীর ওপর গবেষণাটি চালানো হয়।
ফলে দেখা গেছে, ফেসবুকের কিছু ফিচার ব্যবহারকারীকে স্বার্থপর ও কিছু ফিচার তাদের মধ্যে সহানুভূতি জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে। গবেষকরা তাদের ফেসবুক আচরণ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, যার মধ্যে রয়েছে- তারা দিনে কত সময় ফেসবুক ব্যবহার করেন, কতবার তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন ইত্যাদি। তাদেরকে প্রোফাইল ছবি রেটিং করতে বলা হয়। ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, যারা দিনে প্রায় দুই ঘণ্টা ফেসবুক ব্যবহার করেন, তাদের কমপক্ষে ৫০০ জন বন্ধু রয়েছে। আর তাদের শতকরা ৮৯ দশমিক ৫ জনেরই প্রোফাইল ছবি রয়েছে।
জানাগেছে, গবেষণায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে ফেসবুক ব্যবহার ও বিয়ে বিচ্ছেদ বৃদ্ধির হারের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। প্রাপ্ত ফল বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলেন- একটি নির্দিষ্ট অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো এলাকায় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়লে পরের বছর সে এলাকায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বিয়ে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকে।
গবেষণাটি করা হয়েছে মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে। তবে নতুন যারা ফেসবুক ব্যবহারে যুক্ত হন তারাই বিচ্ছেদ ঘটান, নাকি অন্যদের মধ্যে এটি হয়ে থাকে তা পরিষ্কার নয়। এমনকি গবেষকরা সেটি নিশ্চিত করে বলতেও পারেননি।
তবে এতে আতঙ্কিত হয়ে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়ার দরকার নেই। কারণ গবেষকরা ফেসবুক ব্যবহার ও বিয়ে বিচ্ছেদের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেলেও এর মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক (একটির কারণে অন্যটি ঘটা) থাকার দাবি করেননি। আর এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও এ সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী বিবাহিত নারী পুরুষও এ সমস্যায় নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলছেন। অনেক সময় উষ্ণ আবেদনময় তথ্য আদান-প্রদান করে মনের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছে গোপন প্রেম বা পরকীয়ায়।
যা তাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক কর্মজীবন পর্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এ কারণে ফেসবুক ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
সূত্র: ডেইলি মেইল ও টাইমস অব ইন্ডিয়া