ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

৪০০ বছর বাঁচতে পারে লেক স্টার্জন!

নতুন গবেষণায় লেক স্টার্জনের সম্ভাব্য আয়ু ৪২৭ বছর, আগের ধারণার চেয়ে প্রায় তিন গুণ
ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:০৫, ২২ আগস্ট ২০২৬
৪০০ বছর বাঁচতে পারে লেক স্টার্জন!
লেক স্টার্জন

চার শতাব্দীরও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে একটি মাছ! নতুন এক গবেষণায় উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকস অঞ্চলে পাওয়া লেক স্টার্জন মাছের সম্ভাব্য আয়ু নিয়ে এমনই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বড় আকারের স্ত্রী লেক স্টার্জনের সম্ভাব্য আয়ু সর্বোচ্চ ৪২৭ বছর পর্যন্ত হতে পারে। পুরুষের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আয়ু প্রায় ২৭৯ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানিয়েছে, নতুন গবেষণায় স্ত্রী লেক স্টার্জনের সম্ভাব্য আয়ু ৪২৭ বছর পর্যন্ত হতে পারে। আগে এই মাছের সর্বোচ্চ আয়ু প্রায় ১৫০ বছর বলে ধারণা করা হতো।

Advertisement

এতদিন লেক স্টার্জন সর্বোচ্চ প্রায় ১৫০ বছর বাঁচে বলে ধারণা করা হতো। নতুন গবেষণার ফল সেই ধারণাকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগ, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি, মিশিগান টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং উইসকনসিনের প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের গবেষকেরা এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।

গবেষকেরা সরাসরি ৪০০ বছরের পুরোনো কোনো মাছের বয়স গণনা করেননি। বরং গ্রেট লেকসের পাঁচটি লেক স্টার্জন জনগোষ্ঠীর ওপর ৪৪ বছর ধরে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের সম্ভাব্য আয়ু নির্ধারণ করেছেন।

গবেষণায় মাছগুলো ধরে তাদের দৈর্ঘ্য মাপা, লিঙ্গ নির্ধারণ ও চিহ্নিত করে আবার পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে একই মাছ আবার ধরা পড়লে তার আগের ও পরের আকারের তুলনা করা হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে মাছের বৃদ্ধির হার নির্ণয় করে সম্ভাব্য আয়ু হিসাব করা হয়েছে।

গবেষণাটি জার্নাল অব ফিশ বায়োলজিতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় প্রায় ১৬০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের পুরুষ এবং ১৮০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের স্ত্রী লেক স্টার্জনের বৃদ্ধির হার ও সম্ভাব্য আয়ু আলাদাভাবে হিসাব করা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আয়ু ৯০ থেকে ২৭৯ বছর এবং স্ত্রীর ক্ষেত্রে ৯৯ থেকে ৪২৭ বছর পাওয়া যায়।

লেক স্টার্জনকে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মিঠাপানির মাছগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি খুব ধীরে বেড়ে ওঠে এবং পরিণত বয়সে পৌঁছাতেও অনেক সময় নেয়।

মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা জানিয়েছেন, নতুন গবেষণার ফল থেকে বোঝা যাচ্ছে, লেক স্টার্জন অনেক ক্ষেত্রেই ২০০ বছরের বেশি বাঁচতে পারে এবং কিছু মাছ ৩০০ বছরের কাছাকাছি বা তারও বেশি বয়সে পৌঁছাতে পারে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একটি পুরুষ লেক স্টার্জনকে ৪৬ দশমিক ১ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যে ধরার ৩৪ বছর পর আবার ধরা হয়েছিল। এত দীর্ঘ সময়ে মাছটির দৈর্ঘ্য বেড়েছিল মাত্র ২ দশমিক ৭ ইঞ্চি। অর্থাৎ পরিণত বয়সে পৌঁছানোর পরও এ মাছ অত্যন্ত ধীরে বাড়ে।

লেক স্টার্জনকে অনেক সময় ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলা হয়। কারণ এ মাছের পূর্বপুরুষদের অস্তিত্বের প্রমাণ অন্তত ১০ কোটি বছর আগের জীবাশ্মে পাওয়া যায়। শরীরের ওপর শক্ত হাড়ের মতো পাত বা কাঁটার সারি থাকায় দেখতে অনেকটা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতোও মনে হয়।

মিশিগান প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, নতুন গবেষণায় লেক স্টার্জনের দীর্ঘায়ু আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি বলে উঠে এসেছে।

গবেষণার সর্বোচ্চ হিসাব যদি বাস্তবে কোনো লেক স্টার্জনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তাহলে একটি মাছ একই শতাব্দীর নয়—চার শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে।

ধরা যাক, কোনো লেক স্টার্জন ১৬০০ সালের দিকে জন্মেছিল এবং ২০২৬ সালেও বেঁচে আছে। তাহলে সেটি মানুষের বহু প্রজন্মের পরিবর্তন দেখেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও এক শতাব্দীর বেশি আগে জন্ম নেওয়া কোনো মাছ আজও গ্রেট লেকসের পানিতে সাঁতার কাটতে পারে—এমন সম্ভাবনাই গবেষণার ফলকে এতটা বিস্ময়কর করে তুলেছে।

গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গাটিও এখানেই। ৪২৭ বছর হলো সম্ভাব্য আয়ুর হিসাব, কোনো নির্দিষ্ট মাছের নিশ্চিত বয়স নয়।

গবেষকেরা দীর্ঘ সময়ের চিহ্নিতকরণ ও পুনরায় ধরার তথ্য ব্যবহার করে মাছের বৃদ্ধির হার নির্ণয় করেছেন। এরপর সেই বৃদ্ধির হার অনুযায়ী নির্দিষ্ট আকারে পৌঁছাতে একটি মাছের কত বছর লাগতে পারে, তা হিসাব করা হয়েছে। ফলে ৪২৭ বছরকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ আয়ু হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিতভাবে ৪২৭ বছর বয়সী মাছের অস্তিত্ব হিসেবে নয়।

গবেষকদের মতে, লেক স্টার্জনের দীর্ঘ জীবন ও ধীর বৃদ্ধির বিষয়টি এ মাছ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যেসব প্রাণী ধীরে বেড়ে ওঠে, দেরিতে প্রজননক্ষম হয় এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে নতুন প্রজন্ম তৈরি করে, তাদের সংখ্যা কমে গেলে তা পুনরুদ্ধার করাও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।

মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, নতুন গবেষণার ফল লেক স্টার্জন সংরক্ষণ এবং মাছের বয়স নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, গ্রেট লেকসের গভীরে হয়তো এমন কিছু মাছ সাঁতার কাটছে, যাদের জীবনকাল কয়েকটি মানুষের প্রজন্মের সমান। চার শতাব্দী পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে লেক স্টার্জন এখন শুধু একটি মাছ নয়, বরং প্রকৃতির দীর্ঘায়ুর এক বিস্ময়কর উদাহরণ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!