ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

১০০ বছর পর নিউইয়র্কের নদীতে ফিরল ‘ওটার’

দূষণে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর প্রত্যাবর্তন, পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সাফল্যের ইঙ্গিত
ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:১৫, ২২ আগস্ট ২০২৬
১০০ বছর পর নিউইয়র্কের নদীতে ফিরল ‘ওটার’
ব্রঙ্কস নদীতে একটি নদী ওটার (জলভোঁদড়)

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস নদীতে আবার দেখা মিলেছে উত্তর আমেরিকার নদী ওটার বা জলভোঁদড়ের। জুন মাসে একটি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় প্রাণীটির ছবি ধরা পড়ে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের দূষণ ও আবাসস্থল ধ্বংসের পর নদীটির পরিবেশ পুনরুদ্ধারের যে চেষ্টা চলছে, এই প্রাণীর ফিরে আসা তার একটি আশাব্যঞ্জক ফল।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ব্রঙ্কস নদীতে নদী ওটারের এই উপস্থিতি এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা। জুন মাসে নদীর তীরে বসানো একটি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় প্রাণীটির ছবি ধরা পড়ে। পরে ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানাভিত্তিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থার বিশেষজ্ঞরা ছবিটি পরীক্ষা করে ওটারটির উপস্থিতি নিশ্চিত করেন।

Advertisement

প্রাণীটির ছবি তুলেছেন স্থানীয় গবেষক আর জে হকিন্স। ২৩ জুন রাতে নদীর পাশে স্থাপন করা নড়াচড়া-সংবেদনশীল ক্যামেরায় ওটারটির ছবি ওঠে। হকিন্স দীর্ঘদিন ধরে ব্রঙ্কস নদীর বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের কাজ করছেন। ছবিটি প্রথম দেখার পর তিনি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে সেখানে একটি ওটার দেখা গেছে বলে জানান।

দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ব্রঙ্কস নদীর এই অংশে উত্তর আমেরিকার নদী ওটারের সর্বশেষ নথিভুক্ত উপস্থিতি ছিল প্রায় ১০০ বছর আগে। একসময় নিউইয়র্কের বিভিন্ন জলপথে প্রাণীটি সাধারণভাবে দেখা গেলেও দূষণ, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অনিয়ন্ত্রিত শিকারের কারণে শহরটির অনেক এলাকা থেকে এটি হারিয়ে যায়।

বর্তমানের এই দৃশ্যের সঙ্গে ব্রঙ্কস নদীর অতীতের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন ও নানা ধরনের আবর্জনা নদীতে ফেলা হতো। ফলে নদীর পানির মান মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং বহু জলজ প্রাণীর জন্য এটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গথামিস্ট জানিয়েছে, উনিশ শতকের শুরু থেকেই ব্রঙ্কস নদী দূষণের শিকার ছিল। একপর্যায়ে শিল্পবর্জ্য ও মানুষের অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হতো। ফলে নদীটি কার্যত একটি উন্মুক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছিল।

তবে কয়েক দশক ধরে নদী পরিষ্কার করা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে নদীর পরিবেশে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ঝিনুক ও বিভারসহ বিভিন্ন প্রাণীও আবার নদী এলাকায় ফিরে আসে। প্রায় ২০০ বছর পর ২০০৭ সালে ব্রঙ্কস নদীতে বিভারের ফিরে আসাও এই পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

নদী ওটার সাধারণত পরিষ্কার পানি, পর্যাপ্ত মাছ এবং সুস্থ জলজ আবাসস্থলের ওপর নির্ভরশীল। তাই কোনো নদীতে এ প্রাণীর উপস্থিতিকে অনেক সময় সেই জলজ পরিবেশের স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নদী ওটার একসময় আমেরিকার বহু জলপথে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু দূষণ, আবাসস্থল হারানো এবং অতিরিক্ত শিকারের কারণে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তাদের সংখ্যা অনেক এলাকায় ব্যাপকভাবে কমে যায়।

ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারাও এই প্রত্যাবর্তনকে নদী ও মানুষের—দুই পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার পানি ও স্বাস্থ্যকর আবাসস্থল তৈরির যে কাজ চলছে, এই প্রাণীর উপস্থিতি তার সুফলের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ বলে মনে করছেন তারা।

এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একটি প্রাণীকে ক্যামেরায় দেখা যাওয়াই সেখানে স্থায়ীভাবে ওটারের একটি জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে—এমন প্রমাণ নয়।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একক একটি পর্যবেক্ষণ। তবে এর মাধ্যমে অন্তত বোঝা যাচ্ছে, ব্রঙ্কস নদীর পরিবেশ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে বহু বছর ধরে অনুপস্থিত থাকা একটি প্রাণী সেখানে টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে।

ব্রঙ্কস নদীতে ওটারের ফিরে আসার ঘটনা তাই শুধু একটি বিরল প্রাণী দেখার খবর নয়। এটি দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিন দূষিত একটি শহুরে নদীকেও ধারাবাহিক পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আবার বন্যপ্রাণীর উপযোগী করে তোলা সম্ভব।

এক শতাব্দী আগে যে প্রাণীটি ব্রঙ্কস নদী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, আজ তার ক্যামেরায় ফিরে আসার ছবি যেন সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক। নদী পরিষ্কার হলে প্রকৃতিও যে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা ফিরে পেতে পারে—ব্রঙ্কস নদীর ওটার সেই গল্পই বলছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!