ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু আপনার ভেতরেই!

মাহি আসহাব স্বপ্নীল
প্রকাশিত: ১১:০২, ২৩ আগস্ট ২০২৬
আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু আপনার ভেতরেই!
একজন মানুষ যখন ইগোর শিকার হয় তখন সে অযথাই নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় ভাবতে শুরু করে। তারচেয়ে কেউ কোনও কিছুতে ভাল হলে সে কোনও না কোনও ভাবে তার ভুল ধরার চেষ্টা করে। যে কোনও ভাবে অন্য মানুষকে ছোট করার চেষ্টা করতে থাকে। আর এর ফলে সাধারন মানুষ তো তাকে পছন্দ করেই ন

মার্কিন তরুন লেখক ‘রায়ান হলিডে’র মতে ইগো হচ্ছে “নিজের বড়ত্বের প্রতি একটি অস্বাভাবিক বিশ্বাস। যার সাথে মিশে থাকে অতি অহঙ্কার এবং আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর উচ্চাকাঙ্খা।”

Ryan Holiday তার বই Ego is the enemy তে বললেন — আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরে নেই, আপনার ভেতরে। আর সেই শত্রুর নাম- ইগো!‍ হ্যাঁ, আপনার ইগোই আপনার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্রু! সমস্যাকে ইগো’র চেয়ে ঈর্ষা বা হিংসা বলা ভাল। ঈর্ষা ইগোর একটি অংশ হলেও ইগোর ব্যপ্তি আরও বড়।

‘ইগো ইজ দ্যা এনিমি’ বইয়ে লেখক জীবনের প্রধান তিনটি পর্যায়ের কথা বলেছেন, যেগুলোকে ইগো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করতে পারে। লেখকের মতে, যাদের মাঝে সত্যিকার লক্ষ্য ও আকাঙ্খার বদলে ইগো আছে, তারা আসলে কাজ করে না। কাজের চেয়ে তারা কথা বলেই বেশি সময় নষ্ট করে। ইগো একজন মানুষকে বিশ্বাস করায় যে সে সব জানে। আকাঙ্খা একজন মানুষকে বিশ্বাস করায় যে শেখার কোনও শেষ নেই। 

Advertisement

একজন মানুষ যখন ইগোর শিকার হয় তখন সে অযথাই নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় ভাবতে শুরু করে। তারচেয়ে কেউ কোনও কিছুতে ভাল হলে সে কোনও না কোনও ভাবে তার ভুল ধরার চেষ্টা করে। যে কোনও ভাবে অন্য মানুষকে ছোট করার চেষ্টা করতে থাকে। আর এর ফলে সাধারন মানুষ তো তাকে পছন্দ করেই না, কাছের মানুষগুলোও দূরে চলে যায়। ইগো আসলে একটি মানসিক প্যারালাইসিস, যা আপনাকে শোয়া অবস্থায় বিশ্বাস করায় আপনি এখন উড়ছেন।

Acknowledging the ego - enjoy every training session

ইগো মানে কী?

ইগো মানে শুধু অহংকার নয়। ইগো একটি পরিচিত শব্দ। বাংলা অনেকগুলো অর্থ- আমি, আমিত্ব, অহম, অহংবোধ, স্বাতন্ত্র্যবোধ, আত্মমর্যাদা, ঈষা, ইত্যাদি।

ইগো হলো — সেই কণ্ঠ যেটা বলে আপনি বিশেষ। 
- “আমি সবার চেয়ে ভালো জানি।”
- “আমার শেখার দরকার নেই।”
“আমি যা করছি ঠিক করছি।”
- “আমাকে স্বীকৃতি দিতেই হবে।”

এই কণ্ঠটা ভালো লাগে শুনতে। কিন্তু এটাই আপনাকে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করে।

মস্তিষ্কে কী হচ্ছে?

ইগো আসলে- মস্তিষ্কের একটা রক্ষা ব্যবস্থা। নিজেকে ভালো মনে করা — এটা মস্তিষ্ককে আত্মবিশ্বাস দেয়। কিন্তু যখন এটা অতিরিক্ত হয় — মস্তিষ্ক সত্য দেখা বন্ধ করে।

২০১২ সালে Journal of Personality-তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে — উচ্চ ইগোর মানুষ নিজের ভুল দেখতে পান না। কারণ ভুল স্বীকার করা মানে ইগোতে আঘাত। আর মস্তিষ্ক ইগোকে রক্ষা করতে সত্যকেই অস্বীকার করে। মানে — ইগো যত বড় শেখার ক্ষমতা তত কম। আর যে শেখে না — সে এগোয় না।

Holiday-র তিনটা পর্যায়। Holiday বললেন — জীবনের তিনটা পর্যায়ে ইগো আমাদের শত্রু। 

প্রথম পর্যায় — যখন আপনি স্বপ্ন দেখছেন। ইগো বলে —
“আমি কথা বলব, কাজ পরে করব।” ইগোর মানুষ
পরিকল্পনার গল্প বলে বেড়ায়। কিন্তু কাজ করে না। কারণ কথা বললে তাৎক্ষণিক প্রশংসা পাওয়া যায়। কাজ করতে কষ্ট লাগে।

Holiday বললেন — “Talk depletes us.”। বেশি কথা বললে
কাজ করার শক্তি কমে। চুপ থাকুন। কাজ করুন। ফলাফল কথা বলুক।

দ্বিতীয় পর্যায় — যখন আপনি সফল হচ্ছেন। এখানে ইগো
সবচেয়ে বিপজ্জনক। একটু সাফল্য এলে ইগো বলে —
“আমি পৌঁছে গেছি। আমার আর শেখার দরকার নেই।” এই মুহূর্তেই পতন শুরু হয়।

Holiday বললেন — “যে শেখা বন্ধ করে দেয় — সে সেখানেই থেমে যায়।” সবচেয়ে সফল মানুষরা সারাজীবন ছাত্র থাকেন। কারণ তারা জানে — “আমি সব জানি না।”

তৃতীয় পর্যায় — যখন আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন। ব্যর্থতার সময়
ইগো বলে — “এটা আমার দোষ নয়। অন্যরা আমাকে বুঝল না।
পরিস্থিতি খারাপ ছিল।” ইগো দোষ অন্যের ঘাড়ে দেয়। আর যে অন্যকে দোষ দেয় — সে শেখে না। বদলায় না। এগোয় না। বিনয়ী মানুষ বলে — “আমার কোথায় ভুল হলো? পরেরবার কী করব?” 
এই প্রশ্নটাই ব্যর্থতাকে শিক্ষায় বদলায়। ইসলামও এটাই বলে। ইগো, অহংকার, ইসলামে সবচেয়ে নিন্দিত।

রাসূল ﷺ বলেছেন — “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে — সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” কেন এত কঠিন কথা? কারণ অহংকার মানুষকে সত্য থেকে দূরে রাখে। শেখা থেকে দূরে রাখে।
আল্লাহর কাছে নত হওয়া থেকে দূরে রাখে।

ইবলিস জ্ঞানী ছিল। ইবাদতকারী ছিল। কিন্তু একটা অহংকার —
“আমি তার চেয়ে ভালো” — তাকে চিরতরে ধ্বংস করল। ইগোই ছিল প্রথম পাপের মূল।

তিনটা কাজ। 
প্রথম কাজ — কম বলুন, বেশি করুন। পরিকল্পনার গল্প
সবাইকে বলে বেড়াবেন না। চুপচাপ কাজ করুন।
ফলাফল নিজেই কথা বলবে।

দ্বিতীয় কাজ — সবসময় ছাত্র থাকুন।
যতই সফল হোন । নিজেকে বলুন — “আমি এখনো শিখছি।
আমি সব জানি না।” এই একটা মনোভাব আপনাকে আজীবন
এগিয়ে রাখবে।

তৃতীয় কাজ — ব্যর্থতায় আয়না দেখুন, জানালা নয়।
ব্যর্থতার সময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অন্যকে দোষ দেবেন না। আয়নায় নিজেকে দেখুন। “আমার কোথায় উন্নতি দরকার?”
এই প্রশ্নটাই আপনাকে বড় করবে।

Holiday বললেন — “Ego is the enemy of what you want and of what you have.”। ইগো আপনার শত্রু — যা আপনি চান তার।
আর যা আপনার আছে তার। ইগো আপনাকে স্বপ্ন থেকে দূরে রাখে। যা পেয়েছেন তাও নষ্ট করে। সবচেয়ে বড় মানুষরা সবচেয়ে বিনয়ী। কারণ তারা জানে — “আমি যত বড় হই , তত বেশি নত থাকতে হবে।”

37,100+ Ego Man Stock Photos, Pictures & Royalty-Free Images - iStock


ইগো (ego) দেখানোর কিছু বাস্তব উদাহরণ

১. ভুল স্বীকার না করা
কেউ স্পষ্টভাবে ভুল করেছে, কিন্তু সে সেটা মানতে চায় না—শুধু নিজের সম্মান রক্ষা করার জন্য তর্ক চালিয়ে যায়।

২. সবসময় নিজের কথাই ঠিক ভাবা
আলোচনায় অন্য কারও মতামত না শুনে, “আমিই ঠিক” এই মনোভাব ধরে রাখা।

৩. ক্ষমা চাইতে না পারা
ভুল করলেও “সরি” বলতে লজ্জা বা অহংকার কাজ করে।

৪. ছোট কাজ করতে লজ্জা পাওয়া
ধরুন, কেউ মনে করে এই কাজটা তার “স্ট্যাটাসের নিচে”—এটা ইগোর একটা সাধারণ উদাহরণ।

৫. অন্যের সাফল্যে বিরক্ত হওয়া
কেউ ভালো করলে খুশি না হয়ে ভিতরে ভিতরে হিংসা করা বা তাকে ছোট করার চেষ্টা করা।

৬. আগে কথা না বলা
বন্ধু বা কাছের মানুষের সাথে ঝগড়া হলে, “সে আগে কথা বলুক”—এই জেদ ধরে রাখা।

৭. সাহায্য চাইতে না চাওয়া
প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও শুধু অহংকারের কারণে কারও কাছে সাহায্য না চাওয়া।


ইগো’ ও আত্মযাদার পার্থক্য
১) সেল্ফ রেসপেক্ট হলো, আপনি জানেন যে আপনি ভাল মানুষ আর ইগো হলো আপনি মনে করেন যে আপনি অন্য সবার থেকে ভাল। সেল্ফ রেসপেক্ট হলো আপনি জানেন যে আপনি বুদ্ধিমান আর ইগো হলো আপনি মনে করেন যে আপনি সকলের চেয়ে জ্ঞানি।

২) সেল্ফরেসপেক্ট যখন তার সীমারেখা ক্রস করে এবং অপরকে আঘাত করতে শুর করে তখন সেটা ইগোতে রুপান্তরিত হয়।

৩) ইগো তৈরী হয় হলো স্ফীত আত্মসম্মান থেকে এবং আত্নসম্মানবোধ বা সেল্ফ রেসপেক্ট তৈরী হয় হলো সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্য অনুধাবন করার মধ্যদিয়ে।

৪) ইগো হলো কষ্টদায়ক অহংকার আর ‘সেল্ফ রেসপেক্ট’ হলো সমাজে নিজের সঠিক মর্যাদা অনুধাবন করতে পারা।

৫) সেল্ফ রেসপেক্ট হলো সব সময় ধ্রুব সত্য এবং ইগো নিজ থেকে প্রকাশ করা।

৬) ইগো হলো কোন কিছুর প্রতি নিজস্ব ভংগিমা বা নিজের অবস্থান যেটাকে ব্যাক্তির এটিটিউড ও বলা যায়।

৭) ইগো হলো মর্যাদা আদায় করার চেষ্টা। সেল্ফ রেসপেক্ট হলো নিচু হওয়া।

৮) ইগোর মানে হলো এটা মনে করা যে, আমি হলাম এই পৃথিবীর জন্য একটা বড় উপহার। আমি হলাম সকলের মধ্যমনি। কাজেই আমাকে ঘিরেই সকল কর্ম সম্পাদন হওয়া উচিত। আর সেল্ফ রেসপেক্ট হলো নিজের লিমিটেশন সমন্ধে অবগত হওয়া। এবং নিজের মধ্যে যেই দক্ষতা আছে সেটা জাহির করতে না চাওয়া।

৯) সেল্ফ রেসপেক্ট হলো নিজের উপর বিশ্বাস রাখা আর ইগো হলো নিজেকে অপরের চেয়ে ভাল মনে করা।

১০) ইগো হলো কেবল নিজেকে নিয়েই চিন্তা করা, মানুষ তার সমন্ধে কি বললো বা না বললো সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা। সেল্ফ রেসপেক্ট হলো নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার পাশাপশি অন্যদের ধ্যানধারনা নিয়েও চিন্তা করা।

১১. কেহ কেহ বলেন: যার মধ্যে অতিমাত্রায় ইগো থাকে তার মধ্যে জিরো মাত্রায় ‘সেল্ফ রেসপেক্ট’ থাকে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!