ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

গুনে নয়, যে দেশে টাকা বিক্রি হয় কেজি দরে!

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪:১৫, ২৬ আগস্ট ২০২৬
গুনে নয়, যে দেশে টাকা বিক্রি হয় কেজি দরে!
সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগেইসার রাস্তায় টাকার স্তূপ। বিপুল পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা গুনে নয়, কখনো কখনো ওজন করেই হিসাব করা হয়।

টাকা দিয়ে কেনাকাটা—পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। বাজারে গেলে টাকা দিয়ে চাল, ডাল, সবজি কিংবা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয়। কিন্তু পৃথিবীর একটি দেশে গল্পটা যেন একটু উল্টো। সেখানে বাজারে শুধু পণ্য নয়, টাকাও টাকা দিয়ে কেনাবেচা হয়। আর বিপুল পরিমাণ সেই টাকা কখনো কখনো গুনে নয়, ওজন করে হিসাব করা হয়।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগেইসার বাজারে এমন দৃশ্য বহু বছর ধরে  চলছে। রাস্তার পাশে সারি করে বসেন মুদ্রা ব্যবসায়ীরা। তাদের সামনে সাজানো থাকে স্থানীয় মুদ্রা সোমালিল্যান্ড শিলিংয়ের বিশাল বিশাল স্তূপ। কোথাও নোটের বান্ডিল, কোথাও বস্তাভর্তি টাকা, আবার কোথাও টাকার স্তূপ এত বড় যে দেখলে মনে হতে পারে কোনো গুদামে রাখা পণ্য।

Advertisement

কিন্তু এই টাকা দিয়ে পণ্য কেনা হচ্ছে না। টাকাই সেখানে পণ্য।

হারগেইসার এই অদ্ভুত বাজারে একজন ব্যক্তি মার্কিন ডলার, ইউরো কিংবা ব্রিটিশ পাউন্ড নিয়ে হাজির হতে পারেন। বিনিময়ে তিনি পাবেন স্থানীয় মুদ্রা সোমালিল্যান্ড শিলিং। তবে বিদেশি মুদ্রার বিপরীতে যে পরিমাণ শিলিং হাতে পাবেন, তা এত বিপুল যে তা গুনে নেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য।

এ কারণেই বাজারে গড়ে উঠেছে অভিনব এক পদ্ধতি— ওজন করে টাকা হিসাব করা।

একটি প্রতিবেদনে হারগেইসার বাজারের এমন দৃশ্যের বর্ণনা পাওয়া গেছে, যেখানে মুদ্রা ব্যবসায়ীরা নোটের স্তূপ ওজন করে তার মূল্য নির্ধারণ করেন। অর্থাৎ এখানে ‘এক কেজি আলু’ বা ‘দুই কেজি পেঁয়াজের’ মতো করে টাকা বিক্রির বিষয়টি আসলে বিপুল পরিমাণ নোটের ওজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

দৃশ্যটি এতটাই অস্বাভাবিক যে, বাইরে থেকে আসা মানুষের কাছে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে—কেউ বুঝি টাকা বিক্রি করছে!

সোমালিল্যান্ডের এই বাজারের সবচেয়ে মজার বর্ণনা পাওয়া গেছে বিবিসির ভ্রমণবিষয়ক প্রতিবেদনে। সাংবাদিক ও ভ্রমণ উপস্থাপক সাইমন রিভ হারগেইসায় গিয়ে মুদ্রা বিনিময়ের এই অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখেছেন।

তার অভিজ্ঞতায়, ১০০ মার্কিন ডলার স্থানীয় মুদ্রায় পরিবর্তন করার পর হাতে আসে এত বিপুলসংখ্যক শিলিং যে তা সাধারণভাবে বহন করা কঠিন। টাকার পরিমাণ দেখে নিজেকে কোটিপতি মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়—কিন্তু সেই ‘কোটিপতি’ হওয়ার আনন্দের সঙ্গে আসে বড় একটি সমস্যা।

এত টাকা রাখবেন কোথায়, আর নিয়ে যাবেন কীভাবে?

এখানেই আসে ঠেলাগাড়ি কিংবা বড় ব্যাগের প্রয়োজন।

সাধারণ কোনো দেশে ১০০ ডলার ভাঙালে কয়েকটি নোট বা সামান্য কিছু স্থানীয় মুদ্রা হাতে আসে। কিন্তু হারগেইসার বাজারের দৃশ্য অনেকটাই ভিন্ন। সেখানে বিদেশি মুদ্রার বিনিময়ে স্থানীয় মুদ্রার বিপুল বান্ডিল পাওয়া যেতে পারে।

এই বাজারের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো—রাস্তার পাশে বিপুল পরিমাণ টাকা পড়ে থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেই অর্থ নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্ক দেখা যায় না।

কারণ, নোটের সংখ্যা যতই বেশি হোক, তার প্রকৃত মূল্য ততটা বেশি নয়।

সাইমন রিভের বর্ণনায় হারগেইসার বাজারে টাকার স্তূপ দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল—এত টাকা প্রকাশ্য রাস্তায় পড়ে আছে, তাহলে পাহারা কোথায়?

উত্তরটিও ছিল বেশ চমকপ্রদ।

যে অর্থ দেখতে বিশাল, সেটি বহন করাই যেখানে ঝামেলার, সেখানে চোরের কাছে সেটির আকর্ষণও তুলনামূলক কম। একটি ছোট ব্যাগে লাখ লাখ বা কোটি কোটি শিলিং বহন করা গেলেও সেটি আন্তর্জাতিক মুদ্রায় খুব বড় অঙ্ক নাও হতে পারে।
বিপুল পরিমাণ নোট থাকলেও সেগুলোর প্রকৃত মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় এই অর্থ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও অন্য দেশের তুলনায় ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে—এমন বর্ণনা পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, টাকার পাহাড় আছে, কিন্তু পাহাড়ের দাম কম।

এর পেছনে রয়েছে সোমালিল্যান্ডের মুদ্রার মূল্য ও দেশটির অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে দেশটি এখনো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত নয়। নিজস্ব সরকার, প্রশাসন ও মুদ্রা ব্যবস্থা থাকলেও এর অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে।

সোমালিল্যান্ডের নিজস্ব মুদ্রা হলো শিলিং। সময়ের সঙ্গে মার্কিন ডলারের তুলনায় স্থানীয় মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন লেনদেনে বিপুল পরিমাণ শিলিংয়ের প্রয়োজন হতে থাকে।

২০০০ সালের দিকে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১০ হাজার সোমালিল্যান্ড শিলিংয়ের হিসাব পাওয়া যায়। পাঁচ বছর পর বিনিময় হার কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯ হাজার শিলিংয়ের কাছাকাছি ছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে বিনিময় হারের চিত্র বদলেছে। ফলে পুরোনো প্রতিবেদনে যে হার পাওয়া যায়, সেটিকে বর্তমান বিনিময় হার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

এই দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রা পরিস্থিতিই হারগেইসায় নগদ অর্থের এমন অস্বাভাবিক বাজার তৈরির অন্যতম কারণ।

সাধারণ অর্থনীতিতে টাকা হলো পণ্য ও সেবার বিনিময়ের মাধ্যম। আপনি টাকা দিয়ে বাজার থেকে চাল কিনবেন, দোকান থেকে কাপড় কিনবেন কিংবা কোনো সেবার মূল্য পরিশোধ করবেন।

কিন্তু হারগেইসার এই বাজারে টাকা নিজেই যেন একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে।

একজন বিক্রেতার কাছে ডলার এলে তিনি বিনিময়ে শিলিং দেন। আবার সেই শিলিং অন্য কেউ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেন। ফলে এখানে একই সঙ্গে টাকা হলো বিনিময়ের মাধ্যম এবং লেনদেনের বিষয়।

এ কারণেই হারগেইসার রাস্তার পাশের এই বাজারকে বিশ্বের অন্যতম অদ্ভুত মুদ্রা বাজার হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এই বাজারের অদ্ভুতত্ব বোঝাতে একটি প্রতিবেদনে এমন তুলনাও এসেছে—নগদ অর্থের স্তূপের মূল্য কখনো কখনো কয়েক কেজি আলু বা অন্যান্য সাধারণ পণ্যের দামের সঙ্গে তুলনা করার মতো হয়ে যায়।

অর্থাৎ, একদিকে চোখের সামনে বিশাল পরিমাণ নোট; অন্যদিকে সেই নোটের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা খুব সীমিত।

এখানেই মুদ্রার প্রকৃত মূল্য নিয়ে আসে চমৎকার এক শিক্ষা।

নোটের সংখ্যা বেশি হলেই মানুষ ধনী হয় না।

একটি দেশের মুদ্রার মূল্য যদি কমে যায়, তাহলে একই পণ্য কিনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি নোট প্রয়োজন হতে পারে। তখন মানুষের পকেট ভরে যায় টাকা দিয়ে, কিন্তু সেই টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

প্রকাশিত পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে সোমালিল্যান্ডের শিলিং ও বাংলাদেশি টাকার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়। তবে বিনিময় হার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তাই পুরোনো প্রতিবেদনের হারকে বর্তমান হার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

বিষয়টি বোঝার জন্য শুধু একটি দৃশ্য কল্পনা করলেই যথেষ্ট—একজন বাংলাদেশি পর্যটক যদি কয়েকশ ডলার নিয়ে হারগেইসার মুদ্রা বাজারে যান, তার হাতে স্থানীয় মুদ্রার এত বড় বান্ডিল আসতে পারে যে সেটি বহনের জন্য সাধারণ মানিব্যাগ যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন হতে পারে বড় ব্যাগ, এমনকি ঠেলাগাড়িও।

হারগেইসার বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য সম্ভবত রাস্তার পাশে সাজানো টাকার স্তূপ।

একদিকে ফল ও সবজির বাজার। অন্যদিকে মুদ্রা ব্যবসায়ীদের সামনে নোটের বান্ডিল।

কেউ টাকা গুনছেন, কেউ নোট সাজাচ্ছেন, কেউ আবার ক্রেতার হাতে তুলে দিচ্ছেন বিপুল পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা।

দূর থেকে তাকালে মনে হবে, এখানে বুঝি কোনো মূল্যবান পণ্য বিক্রি হচ্ছে। কাছে গেলে বোঝা যায়—পণ্যটি আসলে টাকা।

আর সেই টাকার পরিমাণ এত বেশি যে, অনেক সময় ক্যালকুলেটরের চেয়ে দাঁড়িপাল্লাই বেশি কাজে লাগে!

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

‘সোমালিল্যান্ডে কেজি দরে টাকা বিক্রি হয়’—শিরোনামটি আকর্ষণীয় হলেও এর অর্থ এই নয় যে সেখানে সরকারি কোনো দোকানে গিয়ে নির্দিষ্ট দামে ‘এক কেজি টাকা’ কেনা যায়।

বরং বিপুলসংখ্যক কম মূল্যমানের নোটের লেনদেনে ওজনকে হিসাবের একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—এটাই বিষয়টির মূল কথা।

অর্থাৎ, এটি কোনো সরকারি মুদ্রানীতি নয়; বরং স্থানীয় বাজারের এক অভিনব বাস্তবতা।

মুদ্রার ইতিহাসে টাকা মানুষের সম্পদ, ক্ষমতা ও নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু হারগেইসার বাজার যেন সেই ধারণাকেই উল্টে দেয়।

সেখানে একজন মানুষের হাতে যত বেশি নোট, তার সম্পদ যে তত বেশি—তা নয়। বরং কখনো কখনো বেশি নোট মানেই বেশি বোঝা।

১০০ ডলার বদলে পাওয়া বিপুল শিলিং হয়তো দেখতে লাখ লাখ টাকার মতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তার মূল্য তুলনামূলক কম। তাই সেই অর্থ বহনের জন্য প্রয়োজন হয় বড় ব্যাগ, বস্তা কিংবা ঠেলাগাড়ি।

একসময় যে টাকা মানুষের কাছে ছিল সম্পদের প্রতীক, মূল্য কমে গেলে সেটিই হয়ে যায় কাগজের ভার।

হারগেইসার এই অদ্ভুত মুদ্রা বাজার তাই শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি দেশের অর্থনীতি, মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের গল্প।

বিশ্বের কোথাও টাকা দিয়ে পণ্য কেনা হয়। আবার কোথাও সেই টাকা বদলাতেই হাতে আসে এত বিপুল নোট যে তা গুনে শেষ করা কঠিন।

সোমালিল্যান্ডের হারগেইসা সেই বিরল জায়গাগুলোর একটি, যেখানে টাকা যেন আর শুধু টাকা নয়—টাকাই সেখানে বাজারের পণ্য।

আর সেই বাজারের সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্য?

মানুষ সেখানে টাকা গুনছে না শুধু, কখনো কখনো দাঁড়িপাল্লায় তুলে ওজনও করছে।

টাকার পাহাড় দেখে তাই প্রশ্ন জাগতেই পারে—এত টাকা যার হাতে, সে কি সত্যিই ধনী?

হারগেইসার উত্তরটা বেশ চমকপ্রদ— নোটের স্তূপ বড় হলেই সম্পদ বড় হয় না; আসল কথা হলো সেই স্তূপের ক্রয়ক্ষমতা কতটা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!