বছরজুড়ে চট্টগ্রাম আদালতে আলোচিত যত ঘটনা
মহামারি করোনার কারণে এ বছর শারীরিক ও ভার্চ্যুয়াল দুই উপস্থিতিতে চলেছে চট্টগ্রাম আদালতের কার্যক্রম। পুরো বছরজুড়ে চট্টগ্রামের আদালত পাড়ায় আলোচিত ছিল নানা বিষয়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- অন্যের হয়ে মিনুর জেল খাটা, হাসিনা আক্তারের সাজা খাটেন হাছিনা বেগম, মিতু হত্যা মামলার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন, ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা, মামলার নথি থেকে আইনজীবীর চেক চুরি এবং পুলিশ হত্যা তদন্তে পুলিশের গাফিলতি।
অন্যের হয়ে মিনুর জেল খাটা, মুক্তি পেয়ে ‘চিরমুক্তি’
.png)
২০০৬ সালের জুলাইয়ে নগরীর কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জ এলাকার একটি বাসায় খুন হন পোশাককর্মী কোহিনুর। এরপর বাইরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় সেই লাশ। সে সময় কোহিনুর আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করেছিলেন আরেক পোশাককর্মী কুলসুম আক্তার কুলসুমী।
লাশ উদ্ধারের পর থানায় অপমৃত্যু মামলা হলে তদন্ত শেষে সেটি হত্যাকাণ্ড ছিল বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে উঠে আসে কুলসুমীর সংশ্লিষ্টতা। মোবাইলে কথা বলার ঘটনা নিয়ে কোহিনুরকে গলা টিপে হত্যা করেন কুলসুমী। ওই মামলায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে তার যাবজ্জীবনসহ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড দেন তৎকালীন অতিরিক্ত চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ মো. নুরুল ইসলাম।
সেই সাজার পরোয়ানামূলে ২০১৮ সালের ১২ জুন থেকে কুলসুমী পরিচয়ে জেল খাটছিলেন মিনু। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৮ মার্চ কারাগারের নারী ওয়ার্ড পরিদর্শনে গেলে মিনুর বিষয়টি সিনিয়র জেল সুপার মো. শফিকুল ইসলাম খানের নজরে আসে। এরপর উচ্চ আদালত পর্যন্ত নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১৬ জুন দুপুরে মিনুকে মুক্তির আদেশ দেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁঞার আদালত। ওইদিন বিকেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হন তিনি।
আরো পড়ুন: বাস উল্টে গিয়ে ভ্যানকে দিলো চাপা, ঝরলো ৪ জনের প্রাণ
জানা যায়, ২০১৮ সালের রমজান মাসে জাকাতের টাকা ও খাদ্যসামগ্রী দেয়ার কথা বলে মানসিক ভারসাম্যহীন মিনুকে ডেকে নেন একই এলাকার মর্জিনা আক্তার। এরপর তাকে আদালতে তোলা হয়। বিচারকের খাসকামড়ায় যান মিনু। এর আগেই তাকে শিখিয়ে দেয়া হয় ‘কুলসুম আক্তার’ বলে ডাক দিলে যেন হাত উঠান তিনি। আর সেই হাত উঠানোই কাল হয়ে দাঁড়ায় মিনুর। মুহূর্তেই নিরপরাধ ‘মিনু আক্তার’ হয়ে যান ‘কুলসুম আক্তার’। চলে যেতে হয় কারাগারে।
গত ২৮ জুন রাতে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার বায়েজিদ লিংক রোডে গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন মিনু। পরিচয় না পেয়ে ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফন করে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম। দাফনের পাঁচদিন পর ছবি দেখে লাশটি মিনুর বলে শনাক্ত করে তার পরিবার।
পুলিশ জানায়, ভোররাতে খবর পেয়ে গাড়ির ধাক্কায় আহত মিনুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয় টহল পুলিশ। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিচয় না পেয়ে লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের পাশাপাশি এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়।
‘নামের মিলে’ বিনাদোষে ১৬ মাসের জেল
নগরীর কর্ণফুলী থানার একটি মাদক মামলায় ২০১৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কারাগারে যান হাসিনা আক্তার। পরে একই বছরের ২৭ নভেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন তিনি। এরপর ২০১৯ সালের ১ জুলাই ওই মামলায় তাকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অনাদায়ে আরো এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন অতিরিক্ত পঞ্চম মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস চৌধুরীর আদালত। কিন্তু সাজা পরোয়ানামূলে গ্রেফতার হয়ে ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কারাগারে ছিলেন হাসিনা বেগম।
এক পর্যায়ে বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ মে অতিরিক্ত চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁইয়ার আদালতে শুনানি হয়। শুনানি শেষে কারাগারে থাকা হাসিনা বেগম ও সাজাপ্রাপ্ত হাসিনা আক্তার একই ব্যক্তি কিনা কারাগারের ছবিযুক্ত নথি খতিয়ে দেখে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারকে নির্দেশ দেয় আদালত। পরে প্রতিবেদন দাখিল শেষে ৪ মে আদালতের আদেশে মুক্তি পান বিনা দোষে এক বছর চার মাসের বেশি সময় কারাগারে থাকা হাসিনা বেগম।
‘বাদী থেকে আসামি’ বাবুল আক্তার
২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরের জিইসি মোড়ের কাছে ওআর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে গুলি ও ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন তার স্বামী তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তার। মামলাটি তদন্ত করছিল নগর ডিবি পুলিশ। পরে গত বছরের জানুয়ারিতে ‘আদালতের নির্দেশে’ মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই।
এরপরই ঘুরতে থাকে মামলার গতিপ্রকৃতি। পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসতে থাকে স্ত্রী হত্যার সঙ্গে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততার নানা দিক। গত ১০ মে মামলার বাদি হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবুল আক্তারকে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে ডেকে আনা হয়। এরপরই তাকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরে ১২ মে দুপুরে বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন।
ওই মামলায় বাবুল আক্তারকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। রিমান্ড শেষে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে এসে তা দেননি তিনি।
আরো পড়ুন: ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করলেন হান্নান
এদিকে, গত ২৩ আগস্ট বাবুল আক্তারের করা মামলাটির সব কাগজপত্র জুডিশিয়াল হেফাজতে রাখার আদেশ দেয় আদালত। পরে ১৪ অক্টোবর ওই মামলায় পিবিআইয়ের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর নারাজি আবেদন দেন বাবুল আক্তার। এতে তিনি ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ বলে উল্লেখ করেন। ২৭ অক্টোবর নারাজি আবেদনের ওপর শুনানি হয়। পরে ৩ নভেম্বর পিবিআইয়ের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন খারিজ করে দেয় আদালত। পাশাপাশি মামলাটির অধিকতর তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়।
প্রদীপ ও চুমকির চার কোটির ‘অবৈধ সম্পদ’
গত ২৬ জুলাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার আসামি ও কক্সবাজারের টেকনাফ মডেল থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং তার স্ত্রী চুমকি কারনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন। এতে প্রদীপ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে তিন কোটি ৯৫ লাখ পাঁচ হাজার ৬৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়। এর আগে, গত বছরের ২৩ আগস্ট মামলাটি করেন রিয়াজ উদ্দিন।
২৯ জুন প্রদীপ ও তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে দেয় আদালত। পরে ২০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তার করা আবেদনের প্রেক্ষিতে উল্লিখিত সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেয় আদালত।
১৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়েছে। বিচারক অভিযোগ গঠনের পর তা পড়ে শুনালে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন প্রদীপ।
মামলার নথি থেকে আইনজীবীর ‘চেক চুরি’
গত ৯ সেপ্টেম্বর যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ ৫ম আদালতের মামলার নথি থেকে ২৭ কোটি ৯৭ লাখ ৮৮ হাজার ৭২ টাকার চেক চুরি করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য জোবায়ের মোহাম্মদ আওরঙ্গজেব। ওই ঘটনায় মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ ৫ম আদালতের বিচারক মো. জহির উদ্দিন। ঘটনাটির পর আওরঙ্গজেবকে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে আইনজীবী সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রচেষ্টায় ওই আইনজীবীর কাছ থেকে চেকটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ হত্যা তদন্তে পুলিশেরই ‘গাফিলতি’
নগরীর চান্দগাঁও থানার এক পুলিশ সদস্য হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশের ‘গাফিলতি’ ছিল বলে গত ১৫ নভেম্বর রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন চতুর্থ অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁঞার আদালত।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, পুলিশের মামলায় পুলিশ গাফিলতি ও সহকর্মীর হত্যা মামলা হিসেবে উদাসীনতা-অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। বিষয়টি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের নজরে আনবেন বলে অভিমত প্রকাশ করে আদালত।