তবে এখন বনানী নামের সেই সাদাকালো সিনেমা হল আর নেই। চিরদিনের জন্য বনানীর পর্দা নামলেও সেই নামটি আজও রয়ে গেছে। চার যুগ আগেই বনানী সিনেমা হল বন্ধ হয়। কিন্তু আজও দিনরাতে হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা সেখানে। শুধু সিনেমা হলকে কেন্দ্র করেই সেখানে একটি বন্দর গড়ে ওঠে। সেই বন্দরের নাম বনানী। অথচ সিনেমা হলটি নির্মাণ করার আগে ওই এলাকার নাম ছিল সুলতানগঞ্জ। যে নাম দশ বছরেই পাল্টে হয় বনানী।
বগুড়া শহরের প্রাণ কেন্দ্র সাতমাথা। সেই সাতমাথার দক্ষিণ দিকে ৫ কিলোমিটার দূরে বনানী বন্দরের অবস্থান। ১৯৬৫ সালে টিনের বেড়া দিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয় বনানী সিনেমা হল। বাল্যবন্ধু সিনেমা প্রদর্শনের মধ্যদিয়ে বনানীর যাত্রা শুরু হয়। খুব বেশি সময় এই হলটি চালু ছিল না। ১৯৭৪ সালেই হয়ে যায় বন্ধ। চিরদিনের জন্য পর্দা নামে বনানীর। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তৎকালীন সরকার ওই সিনেমা হলের জায়গাসহ আশেপাশের জায়গা অধিগ্রহণ করে নেয়।
.png)
বনানী নামটির সঙ্গে স্মৃতি জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের। তাদেরই একজন ফনীন্দ্রনাথ সরকার। তিনি একজন মুদি দোকানি। বগুড়ার পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বেজোড়া গ্রামের বাসিন্দা এই ফনীন্দ্রনাথ। ১৯৬৫ সালে ২১ বছরের যুবক ছিলেন তিনি। সুযোগ পেলেই যেতেন সিনেমা হলে। বনানী সিনেমা হলে তার প্রথম দেখা ছবির নাম বাল্যবন্ধু।
ফেলে আসা দিনের কথাগুলো বলার সময় তার চোখে-মুখে আনন্দের দেখা মেলে। তার খুব ইচ্ছে করছে ফিরে পেতে আগের সেই দিনগুলো। এমনটাই প্রকাশ করেন তিনি। সেই ফনীন্দ্রনাথের বয়স এখন ৬৮ বছর।
ডেইলি বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বনানী হলের প্রথম সিনেমা বাল্যবন্ধু। আমি হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখেছি। সেসময় আমি খুব সিনেমা দেখতাম। বনানী হলের নিয়মিত দর্শক ছিলাম।’
তিনি আরো বলেন, ‘বনানী সিনেমা হলে একসঙ্গে কতজন বসে সিনেমা দেখতেন তা এখন মনে করতে পারছি না। তবে ২০০-২৫০ জন একসঙ্গে সেই হলে সিনেমা উপভোগ করতেন। সেসময় অধিকাংশ মানুষই সপরিবারে সিনেমা দেখতে আসেতন। এছাড়াও কিশোর-যুবকেরা একত্র হয়ে সিনেমা দেখতেন আসতেন।’
ফনীন্দ্রনাথ জানান, বগুড়ার সব উপজেলার সিনেমাপ্রেমীদের বনানী সিনেমা হলে আসা-যাওয়া ছিল। ওই সময় এলাকার নাম সুলতানগঞ্জ থাকলেও মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে বনানী নাম। তারা সিনেমা দেখতে আসার আগে বলতেন বনানীতে যাচ্ছি। এভাবেই এলাকার নাম বনানী হয়ে যায়।
বনানী নামের ওই সিনেমা হলের মালিকের নাম মনছুর উর রহমান মন্টু। ২০০৩ সালে তিনি মারা যান। তার পরিবার বনানী এলাকাতেই বসবাস করছেন। তাদের বাড়ির নাম বনানী মহল।
শুক্রবার রাতে মনছুর উর রহমান মন্টুর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার ছেলে তালাত ওয়াসিম নিপ্পনের সঙ্গে।
ডেইলি বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘টিনের বেড়া দিয়ে বনানী সিনেমা হল নির্মাণ করা হয়। জেলাজুড়ে সিনেমা হলটির পরিচিতি ছিল। সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে হলে বসে সিনেমা উপভোগ করতেন। আজ আর সেই বনানী হল নেই। তবে হলের নামটি রয়েই গেছে। শুধু বগুড়াতেই নয়, সারাদেশের মানুষের কাছে আজ পরিচিত বগুড়ার বনানী নামের এই এলাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘বনানীতে প্রথম বাল্যবন্ধু নামের সিনেমা প্রদর্শন করা হয়। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চালু ছিল সিনেমা হলটি। এই হলে কতগুলো প্রদর্শন করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে বাবার কাছে গল্প শুনেছি। তার মধ্যে বাল্যবন্ধুসহ আরেকটি সিনেমার নাম মনে আছে। ওই সিনেমার নাম রাখাল রাজা।’
তালাত ওয়াসিম নিপ্পন আরও জানান, ‘১৯৬৫ সালে সিনেমা হলটি চালু হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তা সাময়িক বন্ধ ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারো সিনেমা হলটি চালু করা হয়। পরে ১৯৭৪ সালে চিরদিনের জন্য বন্ধ করা হয় বনানী হল। এর বছর চারেক পরে সিনেমা হলসহ এর আশেপাশের জায়গা অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার।’
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বনানী সিনেমা হলের সেই স্থানে এখন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের আঞ্চলিক পণ্যাগার। এর একপাশে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় এবং অন্যপাশে পর্যটন মোটেল। এছাড়াও সিনেমা হলের নামে গড়ে ওঠা বনানী বন্দরে রয়েছে ছোট-বড় দুই শতাধিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। এই বন্দরে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রয়োজনে হাজার হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করেন।
তালাত ওয়াসিম নিপ্পন জানান, ‘আমার বাবা যখন সিনেমা হল নির্মাণ করেন ওই সময় আজকের বনানী (আগের নাম সুলতানগঞ্জ ) পুরোটা জুড়ে শুধু গাছ-গাছালি ছিল। সেই কারণে সিনেমা হলের নাম দেওয়া হয় বনানী। পরে পুরো এলাকার নামই হয়ে যায় বনানী।’