ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্ম বিল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হলেও বর্ষা এলেই পদ্মের অপরূপ সৌন্দর্যে মুখর হয়ে ওঠে বিশাল এই বিল। সকাল-বিকেলে ছোট ছোট নৌকায় চড়ে বিলের বুক ঘুরে পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন দর্শনার্থীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই পদ্ম বিলকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। তবে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে শৌচাগার, পোশাক পরিবর্তনের স্থানসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা না থাকায় দর্শনার্থীদের অনেক সময় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাই বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
.png)
সীমান্তঘেঁষা ১২০ একরের পদ্ম বিল
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে আখাউড়া-কসবা আঞ্চলিক সড়ক ধরে মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে টনকি কর্মমঠ এলাকায় পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে স্থানীয়দের কাছে ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্ম বিলের কথা বললেই তাঁরা পথ দেখিয়ে দেন। আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ হওয়ায় ছোট যানবাহনে সেখানে যাওয়া তুলনামূলক সুবিধাজনক। আখাউড়া বা কসবা উপজেলা থেকে সিএনজি অটোরিকশায় সহজেই যাওয়া যায়।
ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এই বিলটি আখাউড়া ও কসবা উপজেলার মধ্যবর্তী এলাকায় বিস্তৃত। স্থানীয়ভাবে এটি ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্ম বিল নামে পরিচিত। কসবা অংশে অনেকে একে গোসাইস্থল পদ্ম বিলও বলেন। বিলটির পশ্চিম পাশে বাংলাদেশের আখাউড়া-কসবা এলাকা এবং পূর্ব পাশে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মাধবপুর থানা। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিলটির আয়তন প্রায় ১২০ একর।
বর্ষা এলেই পদ্মের উৎসব
প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই বিলে পদ্ম ফুটতে শুরু করে। আষাঢ় মাস থেকে ফুল ফুটতে শুরু করে এবং শ্রাবণে বিলের সৌন্দর্য যেন পূর্ণতা পায়। টানা কার্তিক মাস পর্যন্ত কোথাও কোথাও পদ্মের দেখা মেলে।
পদ্মের মৌসুমে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। কেউ আসেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। অনেকেই ছোট ডিঙি নৌকা ভাড়া করে বিলের মাঝখানে গিয়ে পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। নৌকায় বসে চারপাশের ফুলের রাজ্য দেখতে দেখতে অনেকের কাছেই মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
‘প্রকৃতি যেন নিজস্ব রূপে ডানা মেলেছে’
ঢাকা থেকে আখাউড়ায় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে আসা পর্যটক জোনায়েদ হোসেন বলেন, স্বজনদের কাছ থেকে পদ্ম বিলের কথা জানতে পেরে তিনি সেখানে যান। বিলের পাড়ে পৌঁছে পদ্মের সৌন্দর্য ও সুবাস তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
তিনি বলেন, ‘এখানে না এলে প্রকৃতি যে এত সুন্দরভাবে নিজস্ব রূপে ডানা মেলেছে, তা হয়তো দেখাই হতো না। আমাদের দেশের প্রকৃতি কত সুন্দর, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমি চাই, এই সৌন্দর্য কোনোভাবেই নষ্ট না হোক। স্থানীয় প্রশাসন ও মানুষকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।’
স্থানীয় পর্যটক কবীর আহম্মেদ বলেন, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে পদ্মপ্রেমীরা এখানে ছুটে আসেন। ছোট ডিঙি নৌকায় করে বিলের মাঝখানে গেলে মনে হয় যেন অন্য এক জগতে চলে গেছেন।
তবে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকে বিল ঘুরে এসে পোশাক পরিবর্তন বা শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু সেখানে সে ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। পর্যটকদের সুবিধার জন্য এসব ব্যবস্থা দ্রুত করা প্রয়োজন।
ফুল না ছেঁড়ার আহ্বান
পদ্ম বিলের সৌন্দর্য রক্ষায় স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক।
তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত দর্শনার্থী এখানে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা এবং পদ্ম বিলের পরিবেশ রক্ষায় একটি কমিটি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যের পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন গ্রাম পুলিশকেও সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা পদ্মফুল না ছেঁড়েন।
তিনি বলেন, দর্শনার্থীরা ফুল না ছিঁড়লে পদ্ম বিলের সৌন্দর্য দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ন থাকবে। এখানে এসে মানুষ মানসিক প্রশান্তি ও আনন্দ পান। সেই পরিবেশ ধরে রাখা সবার দায়িত্ব।
পর্যটকদের জন্য শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, গত বছরও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে পর্যটকদের সুবিধার জন্য একটি সরকারি শৌচাগার নির্মাণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
‘হাজার মানুষ একটি করে ফুল ছিঁড়লে দশ দিন পর ফুল থাকবে না’
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, বর্তমানে পদ্ম বিলে প্রচুর পদ্ম ফুটেছে। তিনিও সেখানে গিয়েছেন। দর্শনার্থীরা যাতে ফুল না ছেঁড়েন, সে জন্য সাইনবোর্ড ও ব্যানার লাগানো হয়েছিল। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকে সেগুলো সরিয়ে নিয়ে গেছেন এবং ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘হাজার মানুষ যদি প্রতিদিন পদ্ম বিলে আসে এবং প্রত্যেকে একটি করে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যায়, তাহলে দশম দিনে যে দর্শনার্থী আসবেন, তিনি আর কোনো ফুল দেখতে পাবেন না।’
পদ্ম বিলের সৌন্দর্য রক্ষায় একজন গ্রাম পুলিশকে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে জানিয়ে ইউএনও বলেন, দর্শনার্থীদের ফুল না ছেঁড়ার জন্য সচেতন করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে।
পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ওয়াশ ব্লক ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পদ্ম শুধু সৌন্দর্য নয়, পরিবেশেরও বন্ধু
পদ্মের সৌন্দর্যের পাশাপাশি পরিবেশগত গুরুত্বও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনির হোসেন।
তিনি বলেন, পদ্ম বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপায়ে বিস্তার লাভ করতে পারে। পদ্মের বীজ পাখির প্রিয় খাবার। পাখির মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বীজ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক জলধারার মাধ্যমেও পদ্মের বিস্তার ঘটে।
তিনি জানান, পদ্মের ভূগর্ভস্থ কন্দ বা রাইজম দীর্ঘ সময় জীবিত থাকতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে গেলেও মাটির গভীরে থাকা কন্দ টিকে থাকে। পরবর্তী সময়ে আবার পানি এলে সেখান থেকে নতুন পদ্মগাছ জন্ম নেয় এবং ফুল ফোটে।
পদ্ম জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পদ্ম ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের ঝোপ মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এসব উদ্ভিদ না থাকলে অনেক মাছ নিরাপদ আশ্রয় হারাবে। একই সঙ্গে পদ্মের বীজ পাখির খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পদ্ম বিলুপ্ত হলে এর ওপর নির্ভরশীল পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাঁর মতে, পদ্ম বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণ করা শুধু সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়; এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষার সঙ্গেও জড়িত।
ইতিহাসেও প্রাচীন পদ্মের অস্তিত্ব
বৈজ্ঞানিক ও জীবাশ্ম রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ক্রিটেসিয়াস যুগেও পদ্মজাতীয় উদ্ভিদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। দীর্ঘকাল ধরে জলাভূমি ও মিঠাপানির পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত এই উদ্ভিদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবেও পদ্মের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পদ্ম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে দুর্গাপূজার আগের সময়ে এই বিলে পদ্ম দেখতে অনেক দর্শনার্থীর আগ্রহ থাকে।
প্রকৃতির আপন নিয়মে প্রতিবছর বর্ষায় পদ্মে ভরে ওঠা আখাউড়ার এই ১২০ একরের জলাভূমি এখন শুধু স্থানীয়দের নয়, দূর-দূরান্তের প্রকৃতিপ্রেমীদেরও টানছে। পরিকল্পিত সংরক্ষণ, দর্শনার্থীদের সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই পদ্ম বিল হয়ে উঠতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি রক্ষা পাবে জলাভূমির জীববৈচিত্র্যও।