নোয়াখালীতে প্রবাসীর আত্মহত্যা, ব্ল্যাকমেইল ও সম্পত্তি বিরোধের অভিযোগ স্ত্রীর
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে সৌদি প্রবাসী নাহিদুল ইসলাম রাকিবের আত্মহত্যার ঘটনায় মাদক সেবনের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল ও টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, হয়রানি ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ তুলে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তার স্ত্রী সুলতানা ইসলাম মীম।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীতে একটি জাতীয় দৈনিকের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন মীম। এ সময় রাকিবের দুই শিশু সন্তানও উপস্থিত ছিল।
লিখিত বক্তব্যে মীম বলেন, গত ৬ জুলাই সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পর পারিবারিক বিভিন্ন বিরোধ নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন তার স্বামী। এর মধ্যে বন্ধু খোরশেদ আলম বাবু, মেহেদী হাসান সাগরসহ কয়েকজনের সঙ্গে মাদক সেবনের সময় গোপনে একটি ভিডিও ধারণ করা হয় বলে রাকিব তাকে জানিয়েছিলেন।
.png)
তার দাবি, ওই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে রাকিবের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন তার দূরসম্পর্কের চাচা শেখ সাহাব উদ্দিন। বিষয়টি নিয়ে রাকিব মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আবার সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি।
মীম জানান, গত ১০ জুলাই মেসেঞ্জারে ফোন করে শেখ সাহাব উদ্দিন রাকিবের কাছে টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে চাপের মুখে রাকিব তাকে ৫০ হাজার টাকা দেন। ১৩ জুলাই মীম দুই সন্তানকে নিয়ে তার বোনের বাড়িতে যাওয়ার আগে স্বামীকে সঙ্গে যেতে বলেছিলেন। তখন রাকিব ভিডিও ও ব্ল্যাকমেইলের বিষয়টি জানিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথা বলেন এবং তাকে সন্তানদের নিয়ে দাওয়াতে যেতে বলেন।
পরদিন বাড়িতে ফিরে মীম দেখতে পান, ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরে পরিবারের লোকজনের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে রাকিবকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
সংবাদ সম্মেলনে মীম আরও অভিযোগ করেন, রাকিব মাদকাসক্ত ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময় তাকে হেনস্তা করতেন। শ্বশুর-শাশুড়ির মৃত্যুর পর তাকে পরিবার থেকে আলাদা করে দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
বিদেশে যাওয়ার জন্য রাকিব পারিবারিক সম্পত্তির একটি অংশ চাইলে তার চাচা হেলাল উদ্দিন, মোশাররফ, বোন সুইটি আক্তার ও খালা রিনা আক্তারসহ কয়েকজন তাকে মারধর ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ মীমের।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সোনাইমুড়ী বাইপাস এলাকায় রাকিবের মালিকানাধীন ও ভোগদখলে থাকা একটি দোকানঘর তার চাচা হেলাল উদ্দিন জোরপূর্বক দখল করেন। এর প্রতিবাদ করায় রাকিবকে প্রাণনাশ ও মরদেহ গুমের হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
মীমের ভাষ্য, রাকিব সৌদি আরবে চলে যাওয়ার পরও তাদের ওপর হয়রানি অব্যাহত ছিল। পরে স্ত্রী ও সন্তানদের সৌদি আরবে নিয়ে গেলেও একপর্যায়ে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেন রাকিব। এ সময় তার খালা ঢাকার একটি দোকানঘর দখলের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেন মীম। দেশে ফিরে তিনি মতিঝিল থানা ও সোনাইমুড়ী থানায় পৃথক অভিযোগ করেন। পরে থানায় সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে দোকানঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
মীমের দাবি, এরপর অভিযুক্তরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। দোকানঘরের পরিবর্তে বাড়ির দোতলার একটি ফ্ল্যাট তাদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য রাকিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।
এদিকে স্বামীর মৃত্যুর পর তাকেও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মীম। তার দাবি, রাকিবের বন্ধু নাফি আহমেদ ফয়েজের সঙ্গে তার পরকীয়ার সম্পর্ক রয়েছে এমন অভিযোগ তুলে তাকে স্বামীর আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় গত ১৮ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক মাস ২০ দিন কারাভোগের পর ৮ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান তিনি।
মীম আরও বলেন, তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় গত ২১ আগস্ট তার মেয়েকে স্বামীর বসতঘর থেকে বের করে দিয়ে ঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তার বাবা নোয়াখালীর পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মীম বলেন, ‘মাদক সেবনের ভিডিও ধারণ করে আমার স্বামীকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল। ভিডিও দেখিয়ে তার কাছে টাকা দাবি করা হয় এবং তিনি ৫০ হাজার টাকা দেন। এরপর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এসব ঘটনার প্রকৃত সত্য নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক।’
তিনি আরও বলেন, রাকিবকে চাপ, হুমকি, হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার মৃত্যুর পেছনে কারও প্ররোচনা ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দুই সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে সন্তানদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা এবং নাহিদুল ইসলাম রাকিবের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন সুলতানা ইসলাম মীম।