‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়’
‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়...’ এই অমোঘ সত্যের কাছে হার মেনে সব ধরনের ফুটবলকে বিদায় বললেন জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় মেসুত ওজিল।
দীর্ঘদিন জাতীয় দলে ব্রাত্য থাকার পর অবশেষে ফুটবলকেই বিদায় জানালেন ওজিল। তবে বিদায়বেলায় কৃতজ্ঞতা ভরে সাবেক সতীর্থ, জাতীয় দল ও ক্লাবকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলোও আপন করে নিয়েছেন এ জার্মান কিংবদন্তি।
মেসুত ওজিলের বিদায় বেলায় ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য আজকের আয়োজনে থাকছে তার বিশেষ কিছু স্মরণীয় ঘটনা-
.png)
শুরুর জীবন
১৯৮৮ সালের ১৫ই অক্টোবর পশ্চিম জার্মানির জেলসেনকির্সেন শহরে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মেসুত ওজিল। অভিবাসী হওয়ায় তাদের সংসারে টানাপোড়েন লেগেই থাকতো। কোনোরকমে সংসার চালাতেন তার বাবা-মা।
অভাবের সংসারে বেড়ে উঠলেও বাল্যকাল থেকেই ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন ওজিল। বাড়ির কাছেই আবর্জনায় পরিপূর্ণ একটি মাঠে বড় ভাইয়ের সাথে ফুটবল খেলতেন তিনি। কিন্তু একজন অভিবাসী হয়ে জার্মানে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন তৎকালীন যুগে অনেকটা আকাশ কুসুম চিন্তার মতই ছিল।
মাধ্যমিকে পড়ার সময় ‘Monkey Cage’ ফুটবল একাডেমি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ওজিলের। পরে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানি অনুর্ধ্ব-১৭ দলে সুযোগ পান তিনি। এরপর ২০০৭ সালে জার্মানি অনুর্ধ্ব-২১ দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামে এ ফুটবলার।

ফুটবল ক্যারিয়ার
২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ৪.৩ মিলিয়ন ইউরোতে মেসুত ওজিলকে দলে ভেড়ান জার্মান ক্লাব ওয়ার্ডার ব্রেমেন। এ ক্লাবে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে দ্যুতি ছড়িয়ে সবার নজরে আসেন তিনি। ওই মৌসুমে ৩ গোল ও ১৫টি এসিস্টের মাধ্যমে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
জার্মান জাতীয় দলের হয়ে ওজিলের খেলার স্বপ্ন পূরণ হয় ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। নরওয়ের বিরুদ্ধে এক প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। আর জার্মানির হয়ে প্রথম গোলের দেখা পান নিজের তৃতীয় ম্যাচে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।
ধীরে ধীরে জার্মান জাতীয় ফুটবল দলে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন ওজিল। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে মূল একাদশে জায়গা পান তিনি। ওই আসরে সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে দুর্ভাগ্য হেরে যায় তার দল। তবে দল হারলেও বিশ্বমঞ্চে ৩ অ্যাসিস্ট ও ১টি গোলে গোল্ডেন বলের দৌঁড়ে ছিলেন এ ফুটবলার।
মেসুত ওজিলের সেরা সাফল্য আসে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে। ব্রাজিল বিশ্বকাপে জার্মানদের শিরোপা জয়ের নায়ক ছিলেন তিনি। এ আসরে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ৭-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে তারা। এরপর আর্জেন্টিনাকে শেষ মূহুর্তের গোলে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে ডাই ন্যাশনালম্যানশাফটরা।
মূলত এরপর থেকেই বিশ্বের সেরা ক্লাবগুলোর নজরে পড়েন ওজিল। অনেক জল্পনা কল্পনা শেষে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদে যোগদান সম্পর্কে ওজিল বলেছিলেন, এটি এমন একটি ক্লাব যাকে কখনো না বলা যায় না।

সবশেষ ২০১১–১২ মৌসুমে লা লিগায় ১৭টি গোলে অবদান রেখে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন ওজিল। একই বছর উয়েফা অনুমোদিত টুর্নামেন্টে সর্বমোট ২৫ টি অ্যাসিস্ট করে রেকর্ড করেন তিনি। লা লিগা ক্যারিয়ারে ১০৫ ম্যাচে ১৯ গোল ও ৫৫ অ্যাসিস্ট করেন এ ফুটবলার।
তৎকালীন মাদ্রিদ কোচ হোসে মরিনহো ওজিলকে জার্মানির জিদান বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু এতকিছুর পরও রিয়াল মাদ্রিদে বেশি দিন থাকা হয় নি ওজিলের। রিয়াল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোন্দলের ফলে মাত্র দুই মৌসুম পরই ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনালে যোগ দেন এ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।
ওজিলের দল বদল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়েরা। স্বয়ং রোনালদো মন্তব্য করেছিলেন, সে একজন খেলোয়াড় যে গোলের আগে আমার পদক্ষেপগুলো জানত। তার চলে যাওয়া নিয়ে আমি অত্যন্ত অখুশি।
ওজিলের দল বদলকে ইতিহাসের অন্যতম অনাকাঙ্খিত দল বদল বলে বিবেচনা করা হয়। এর ফলে ওজিল জার্মানির ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামি প্লেয়ারের মর্যাদা পান বটে, কিন্তু তিনি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না।
পর্ব দুইয়ে থাকছে ওজিলের ক্যারিয়ারের বাকি অংশ।