ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]
নেত্রকোনায় সাংবাদিক হত্যা

সন্তানদের জন্য আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই!

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২০:৩৮, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সন্তানদের জন্য আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই!
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আমি তো বিচার চাই। আমার জন্য না, আমার দুইটা সন্তান এতিম হয়ে গেছে। এরা কি আর বাবাকে পাবে? আমার মেয়েটা নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে হয়তো বুঝে গেছে। যখন একটু বুঝতে পারছে, আমাকে বুঝাচ্ছে, 'বাবা স্টার হয়ে গেছে মা, তুমি কান্না করবা না।'"—এই আকুতি নেত্রকোনার দুর্গাপুরের নিহত সাংবাদিক লুৎফর জামান ফকিরের স্ত্রী আনন্দিতী সাংমার।

শনিবার সন্ধ্যায় পরিবারটির খোঁজখবর নিতে ব্যারিস্টার কায়সার কামালের পক্ষে তাঁর বাড়িতে যান উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। এই সময় তাঁরা নিহতের পরিবারকে আর্থিক অনুদান ও পোশাক উপহার দেন। পরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন আনন্দিতী সাংমা।

তিনি বলেন, আমার মেয়েটার বয়স মাত্র চার বছর। মাঝে মাঝে হয়তো ভুলে যায়, বাবাকে দেখতে পায় না। তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, 'বাবা কবে আসবে? বা কোথায় গেছে?' আর আমার ছোট ছেলেটা তো ঠিক করে কথাই বলতে পারে না। যখন একটু বড় হবে, কথা বলতে পারবে, তখন সে জানতে চাইবে—'বাবা কোথায়? সবারই তো বাবা আছে। বাবা ডাকলে একজন রেসপন্স করে।' সে তো সারাদিন-সারারাত বাবা বলে ডাকবে, কিন্তু কেউ তো আর রেসপন্স করবে না! কেউ এসে বলবে না যে, 'আমি তোমার বাবা!'

তাই আমি এ জন্যই বিচার চাই। আমার স্বামী তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু আমার স্বামীকে যারা খুন করছে, অন্ততপক্ষে আমার সন্তানদের আমি এটুকু তো বলতে পারব যে, তোমাদের বাবাকে ফিরায় দিতে পারি নাই। কিন্তু আমি তার বিচার চেয়েছি, আমরা বিচার পেয়েছি। এটা তো আমি আমার সন্তানদের বলতে পারব। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।

তিনি আরও বলেন, গত বুধবার একটা পোস্ট করেছিলেন যে, 'কারা জানি ২৫টি বক মেরে খাইছেন।' এরকম একটা হেডলাইন। আমি শুধু হেডলাইনটা দেখেছি, এখনো ভিডিওটা পুরোপুরি দেখিনি। যে ২৫টা বক মেরে নাকি কারা খাইছেন। উনাকে নিয়মিতই তো অনেকেই থ্রেড বা হুমকি দিত। কিন্তু এই পোস্টটার পরে উনাকে আমি আরও বেশি টেনশনে দেখেছি। প্লাস, এটার পর থেকে উনি যার সাথেই কথা বলতেন, একটু উচ্চস্বরে কথা বলতেন। আর এই কয়েক দিন বিশেষ করে এই দুই দিন আগের কথাগুলো বেশি মনে পড়ছে। উনি বলতেন, 'থ্রেড দিয়ে কী হবে?' এগুলা অনেকের মুখেই শুনেছি। 

তারপরে বিকেল দিকে উনাকে ফোনে কার সাথে যেন আলাপ করতে শুনলাম। কী জানি, মানে উনাকে কেউ একজন বলছিলেন যে, 'ভিডিও ডিলিট করার জন্য।' তখন উনি বললেন যে, 'চাইলেই তো আর ভিডিও ডিলিট করা যায় না। চাইলেই তো আর সবকিছু হয় না। আমি ভিডিও ডিলিট করব না।' যার সাথে উনি কথা বলছিলেন, তখন এই কথাটা বলছিলেন। মূলত রিসেন্ট আমি এটুকুই জানি।

তিনি আরো বলেন, এরপরে আবার যেদিন উনার সাথে এই দুর্ঘটনাটা ঘটল। তখনও তো উনি আরেকটা পোস্ট ছাড়ছেন। আর আগেও তো উনি অনেকগুলো পোস্ট ছাড়ছেন। অনেক মানুষের অনিয়মের ব্যাপারে। পোস্টগুলো উনি তো আমাদের দুর্গাপুরে যাঁদেরকে আমরা সন্ত্রাসী বা শীর্ষ সন্ত্রাসী বলে চিনি তাঁদের নিয়েও ছাড়ছেন। একটা না, দুইটা না, অনেকটাই! অনেক জনের বিরুদ্ধেই উনি এমন পোস্ট ছাড়ছেন। এখন উনি বা আল্লাহতায়ালাই ভালো বলতে পারবেন যে উনাকে কে কী করছে। আমি তো নিশ্চিত করে বা কনফার্মলি কাউকে কিছু বলতে পারছি না। আমি যতটুকু জানি, ততটুকুই আপনাদেরকে জানালাম। 

নিজের নিশ্চয়তা ও সন্তানদের নিশ্চয়তা চেয়ে তিনি বলেন, আমার প্রথম চাওয়া তো হলো—খুনিদের দ্রুত বিচার হোক। বিচার শুধু ধরে নিয়ে গিয়ে হাজতে আটকে রাখা নয়, একদম চূড়ান্ত বিচার হোক। আমি ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, এখন তো আমার সব শেষ! মানুষটা যতদিন বেঁচে ছিল, আমাকে চাকরি করতে দেয়নি। কিন্তু এখন যে আমার দুটো বাচ্চা আছে, তাদেরকে তো বড় করতে হবে, মানুষ করতে হবে। আমার বাবাও নাই, শুধু মা আছেন। আমার স্বামী আমাকে সম্পত্তি কিছু না দিয়ে গেলেও শিক্ষিত করে রেখে গেছেন। আমি চাচ্ছি, যদি আমার একটা চাকরি হতো, তাহলে আমার জন্য খুব ভালো হতো।

আমি বিএসসি নার্সিং কমপ্লিট করেছি এবং আমি একজন রেজিস্টার্ড নার্স। আমার নার্সিংয়ের 'আরএন' (RN) নম্বরও আছে। কিছুদিন আগে যে সরকারি নার্সিংয়ের সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও আমি আবেদন করেছি, দুটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষাও দিয়েছি। তো আমি একটু সহযোগিতা চাচ্ছি যে, আমার একটা চাকরির বড্ড দরকার। আর চাকরিটা যদি ঢাকায় হয়, তাহলে বেশি ভালো হয়। কারণ আমার পরিবারও বর্তমানে ঢাকাতেই থাকে এবং আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজনও সবাই ঢাকায়। এই দুটি বাচ্চাকে একা রেখে মফস্বলে থেকে চাকরি করা কঠিন, ঢাকায় থাকলে অন্তত পরিবারের কেউ না কেউ আমার বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে পারবে। মাননীয় ডেপুটি স্পিকার স্যারের কাছে আমি আকুল আবেদন জানাচ্ছি, উনার কাছে আমার জোর দাবি উনি যেন আমাকে একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেন। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/নেত্রকোনা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!