নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বিগ্ন পরিবার, গ্রেফতার ২
ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ৩৫ যাত্রী নিয়ে ট্রলার উল্টে যাওয়ার ঘটনায় নরসিংদীর রায়পুরা থেকে মানব পাচারকারী চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে গত সোমবার রাতে রায়পুরার আমীরগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নরসিংদীর পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে তাদের গ্রেফতারের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। গ্রেফতার দুজন হলেন, রায়পুরা উপজেলার হাসনাবাদ গ্রামের বাচ্চু মোল্লার ছেলে মামুন মোল্লা ও আগানগর গ্রামের কালীপদ শীলের ছেলে সুবল চন্দ্র শীল।
নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা জানান, রায়পুরার হাসনাবাদের মনির চন্দ্র শীল নামের এক ব্যক্তি ৫ বছর যাবৎ লিবিয়ায় বসবাস করেন। এই সূত্র ধরেই বাংলাদেশ থেকে তিনি মানব পাচার করে আসছেন। তার মাধ্যমে রায়পুরা থেকে স্থানীয় লোকজনকে প্রলোভন দেখিয়ে মানব পাচার করেন তারেক মোল্লা নামের এক ব্যক্তি। আর তারেক মোল্লাকে সহযোগিতা করেন মামুন মোল্লা ও সুবল চন্দ্র শীলসহ আরো কয়েকজন। তারা স্থানীয় তরুণ-যুবকদের বৈধ পথে ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মৌখিক চুক্তিতে টাকা নিয়ে থাকেন। মূলত তাদের হাত দিয়েই রায়পুরার ডৌকারচর এলাকার নিখোঁজ আশিষ সূত্রধর, আলামিন ফরাজী ও নাদিম সরকার নামের ৩ জন সাড়ে আট লাখ টাকা মৌখিক চুক্তি করেন। সাড়ে ছয় লাখ টাকা ওই দালালদের হাতে দেওয়ার পর তারা যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের ইতালি না পাঠিয়ে দালাল চক্র লিবিয়াতে পাঠায়। সেখান থেকেই অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠান তারা। নিখোঁজ ওই তিনজনের পরিবারের সদস্যরা রায়পুরা থানায় মামলা করলে মামুন মোল্লা ও সুবল চন্দ্র শীলকে গ্রেফতার করা হয়।
.png)

ওই ঘটনা থেকে বেঁচে আসা আমিরগঞ্জের ইউসুফ মৃধা জানান, দালালদের হাতে সাড়ে ছয় লাখ টাকা করে দেওয়ার পর প্রথমে তাদের দুবাই নিয়ে এক সপ্তাহ রাখা হয়। পরে মিসর হয়ে তাদের পাঠানো হয় লিবিয়ার বেনগাজি শহরে। সেখানে আরো প্রায় দশ দিন থাকার পর ব্যক্তিগত গাড়ির ডেকের ভেতরে ভরে দুই দিনের ভ্রমণ শেষে তাদের নেয়া হয় ত্রিপোলি শহরে। সেখানে একত্র হওয়া ৪২ জন বাংলাদেশিকে গত ২৭ জানুয়ারি রাতে একটি স্থানীয় সৈকতে জড়ো করেন চক্রের মূল দালাল মনির চন্দ্র শীল। পরে ২৫ জনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ট্রলারে ৪২ জনকে ওঠানো হয়। ট্রলারটি দুই মিসরীয় চালক তাদের মধ্যে ৩৭ জনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন।
লিবিয়া থেকে রওনা হয়ে তিউনিসিয়া পার হয়ে মাল্টা জলসীমা অতিক্রম করার সময় এদের একজন চলন্ত ট্রলার থেকে সাগরে পড়ে যান। পরে ট্রলারে থাকা লোকজন পড়ে যাওয়া ব্যক্তিকে ট্রলার তোলার চেষ্টা করলে সাগরের ঢেউয়ে ট্রলার উল্টে গিয়ে যাত্রীরা সাগরে পড়ে যায়। এদের মধ্যে ৭ জন উল্টে যাওয়া ট্রলাররের ওপরে উঠে প্রাণে রক্ষা পান। বাকিরা একেক করে কেউ ডুবে গেছেন, কেউ ভেসে গেছেন। ১১ ঘণ্টা এভাবে থাকার পর দূরে কোস্টগার্ডের জাহাজ দেখে তাদের একজন লাল কাপড় উড়াতে থাকেন। লাল কাপড় দেখে ওই সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও তীরে নেয়ার আগেই একজনের মৃত্যু হয়। ছয়জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রায় এক মাস জেলে রাখার পর স্থানীয় দূতাবাসের সহযোগিতায় দুজন দেশে ফেরেন।
সম্প্রতি লিবিয়া থেকে সাগর পথে ট্রলারে করে ইতালি যাওয়ার পথে বেঁচে ফিরে আসা নরসিংদীর এক যুবক রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জের ইউসুফ মৃধা। তিনি এমন ভয়ঙ্কর বর্ননা দেন। তার বর্ণনা মতে, ট্রলারের ৩৫ যাত্রীর মধ্যে ৬ জন বেঁচে ফিরেছেন, ৬ জনের ২ জন ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন। বাকিরা সাগরে নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ ২৮ জনের মধ্যে নরসিংদীর অন্তত ১৫ জন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিখোঁজ আশিষ সূত্রধরের ভাই আনন্দ সূত্রধর জানান, ‘তারেক মোল্লা স্থানীয় যুবকদের ইতালি যেতে প্রলোভন দেখাতেন। তিনি লিবিয়ার ত্রিপোলিতে থাকা তার বন্ধু মনির চন্দ্র শীলের এজেন্ট হয়ে কাজ করতেন। তাদের সঙ্গে সাড়ে আট লাখ টাকায় ইতালি যাওয়ার চুক্তি হয়। দেশ ছাড়ার আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি টাকা ইতালি পৌঁছার পর পরিশোধের কথা ছিল। দুবাই ও মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে নেওয়া হয় আশিষকে। পরে সেখান থেকে ত্রিপোলি নিয়ে বেশ কিছুদিন রাখা হয়।
গত ২৭ জানুয়ারি আশিষ শেষবারের মতো ফোন করে জানান, রাতে নৌকা করে তাদের ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে। চার দিন আগে দেশে ফেরা ইউসুফের মাধ্যমে জানতে পারি নৌকাটি ডুবে গেছে। পরে ভাইয়ের সন্ধান চেয়ে তারেক মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আশিষ এখনো জীবিত আছে।
নাদিম সরকারের ভাই শামীম সরকার জানান, বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা থাকলেও দালালেরা অবৈধ পথেই ইতালি পাঠায়। অবৈধ পথে ইতালি যাত্রায় নরসিংদী থেকেই ছিলেন অন্তত ২৪ জন। আমরা আমাদের সন্তানদের ফেরত চাই দালালের বিচা চাই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনো নিখোঁজ আছেন ১৫ জন, ১ জন বেঁচে ফিরেছেন, ২ জন ফেরার অপেক্ষায়। ১ জন মারা গেছেন এবং ৫ জন এখনো লিবিয়ায় অবস্থান করছেন।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি অপারেশন) আতাউর রহমান জানান, নিখোঁজ আশিষের বাবা অনিল চন্দ্রের করা মামলায় ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম জানান, লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ আশীষ সূত্রধরের বাবা অনিল চন্দ্র সূত্রধরের করা মামলায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা দুজন আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য বলে জানা গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে তাদের আদালতে তুলে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত মামুন মোল্লাকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। স্থানীয় মূল দালাল তারেক মোল্লাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে ।